গত সপ্তাহান্তে সিঙ্গাপুরে এক বিশেষ ধরনের কোডিং কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন ‘বিজনেস ইনসাইডার’-এর প্রতিবেদক লি চং মিং। সেখানে তিনি এবং আরও কয়েকজন অংশগ্রহণকারী মাত্র দুই দিনেই এআই-এর সাহায্যে নিজেদের অ্যাপ তৈরি করেছেন। তাঁদের শেখানো হয়েছিল ‘ভাইব কোডিং’— যেখানে কোডিংয়ের জটিলতা না জেনেও এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত অ্যাপ তৈরির কৌশল। লি চং মিং নিজেও ছিলেন সম্পূর্ণ কোডিং অজ্ঞ। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে এমন পাঁচটি মূল শিক্ষা, যা যেকোনো নতুনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমেই কর্মশালাটির নাম ছিল ‘কোড উইথ এআই’, আয়োজন করেছিল সিঙ্গাপুরের এআই নির্মাতা দল ‘৬৫ল্যাবস’। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন প্রযুক্তি জগতে নতুন। কেউ ছিলেন ব্যবসায়ী, কেউ বা ফ্যাশন ডিজাইনার— কেউই আগে কখনো প্রকৃত কোডিং করেননি। কিন্তু দুই দিনের মধ্যেই তাঁরা নিজেদের অ্যাপ তৈরির স্বাদ পেয়েছেন। কর্মশালার প্রধান প্রশিক্ষক অগ্রিম সিং বলেন, ‘ভাইব কোডিং-এর মূল কথা হলো এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত প্রোটোটাইপ তৈরি করা। এখানে ভুল হওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং শেখার সুযোগ।’
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথম শিক্ষাই ছিল— ভাঙা অ্যাপের পিছে না ছুটে নতুন করে শুরু করা। লি চং মিং নিজেই এক ঘণ্টার মধ্যে একটি পার্সোনাল ট্রেইনার অ্যাপ তৈরি করেছেন। পুরো প্রক্রিয়াটিতেই মূল সময় ব্যয় হয়েছে এআই-এর প্রতিক্রিয়া পেতে। প্রশিক্ষকরা বারবার বলেছেন, ‘ভাইব কোডিং-এর ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে ধারণাটিই গুরুত্বপূর্ণ।’ যদি কোনো অ্যাপ ঠিক মতো কাজ না করে, তাহলে তা ফেলে দিয়ে নতুন করে শুরু করাই উত্তম। কারণ দ্রুত নির্মাণ ও পরীক্ষার মাধ্যমেই সেরা ধারণাটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
এছাড়া সফল অ্যাপ তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারকারীদের চাহিদা বোঝা। কর্মশালার আরেক প্রশিক্ষক শেরি জিয়াং বলেন, ‘একটি অ্যাপের সফলতা নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীদের উপর। যদি কোনো অ্যাপের ব্যবহারকারী না থাকে, তাহলে তা কখনোই টিকবে না।’ তিনি আরও বলেন, যারা প্রযুক্তিগত জ্ঞানে পিছিয়ে রয়েছেন, তারাই অধিকাংশ সময় এমন অভিনব ধারণা নিয়ে আসেন। যেমন একজন ফেং শুই বিশেষজ্ঞ তাঁর জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অ্যাপ তৈরি করতে পারেন, অথবা একজন খাবারের দোকানের মালিক তাঁর ব্যবসার জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা অ্যাপ তৈরি করতে পারেন।
ভাইব কোডিং-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ত্রুটি সমাধান করা। যেহেতু অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই কোডিংয়ে অপরিচিত, তাই তাঁদের জন্য ডিবাগিং ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। শেরি জিয়াং নিজেও ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু ভাইব কোডিং-এর মাধ্যমেই তিনি কোডিং-এর মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এআই-এর সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমেই আমরা ডিবাগিং শিখেছি। যখনই কোনো ত্রুটি দেখা দিত, আমরা এআইকে জিজ্ঞাসা করতাম কেন এমন হচ্ছে এবং কীভাবে তা ঠিক করা যায়।’
এছাড়া অ্যাপ তৈরির প্রথম ধাপ অর্থাৎ প্রম্পট লেখার গুরুত্বও আলোচিত হয়েছে কর্মশালায়। প্রশিক্ষকরা বলেন, প্রথমেই এআইকে অ্যাপটির পরিকল্পনা করতে বলতে হবে। তারপর সেই পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে কোডিং-এর দিকে এগোতে হবে। অনেক সময় ভুল প্রম্পট দেওয়ার কারণে পুরো অ্যাপটি ভুল হয়ে যায়। তাই প্রথমেই স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রম্পট লেখা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া অ্যাপের ধরন নির্ধারণ, ডাটাবেস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এবং ব্যবহারকারী ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলিও প্রম্পটের মাধ্যমেই সামনে আসে।
সবশেষে, একাধিক এআই মডেল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন প্রশিক্ষকরা। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের এআই মডেল রয়েছে— যেমন চ্যাটজিপিটি, ক্লড, জেমিনি, ন্যানো কলা ইত্যাদি। এছাড়া ভাইব কোডিং-এর জন্য রয়েছে কিউরসর, লাভেবল-এর মতো টুলস। প্রশিক্ষকরা বলেন, কোনো একটি মডেলের উপর নির্ভর না করে নিজের প্রয়োজনে সবচেয়ে উপযুক্ত মডেল বেছে নেওয়া উচিত। কারণ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব টুলসের কার্যক্ষমতাও বদলে যাচ্ছে।
লি চং মিং-এর অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, ভাইব কোডিং শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং ধারণার দ্রুত রূপায়ন। এআই-এর সাহায্যে যে কেউ তাঁর নিজস্ব অ্যাপ তৈরি করতে পারেন— যদি তিনি তাঁর ব্যবহারকারীদের চাহিদা ও তাঁর ধারণাটিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন। দুই দিনের এই কর্মশালাটি অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা, যা তাঁদের প্রযুক্তির জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন