‘আমার পছন্দ, আমার দেশ’—এই শ্লোগানটি রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থল ভালিআসর স্কয়ারের বিশাল বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতীয় দলের নারী ফুটবলাররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের পাশে ছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। দেশের জাতীয় পতাকাবাহী কিছু মানুষের উল্লাস আর অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে তাদের স্বাগত জানানো হয়। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত নারী এশিয়ান কাপে অংশ নিয়েও তিনটি ম্যাচ হারার পরেও এই মুহূর্তটি ছিল তাদের জন্য অর্জনের মুহূর্ত। কিন্তু সেই আনন্দের মাত্র কয়েক দিন পরই যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে বোমা হামলা শুরু হয়।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘এই ক্রীড়াবিদরা তাঁদের মাতৃভূমি, পতাকা, নেতা ও বিপ্লবের প্রতি অনুগত।’ জার্সি আর বাধ্যতামূলক কালো হিজাব পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইছিলেন খেলোয়াড়রা। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে খেলোয়াড়দের মুখগুলো ছিল বিষণ্ণ। তারা হয়তো নিজেদের ভাগ্যের কথা ভেবে শঙ্কিত ছিলেন। কারণ, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে যখন জাতীয় সংগীত বাজছিল, তখন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়েছিল।
এশিয়ান কাপে অংশগ্রহণের আগেই দেশটির সরকার ও সমাজে চলছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা। জানুয়ারিতে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সরকারি বাহিনীর হাতে অন্তত ত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে কয়েকজন তরুণের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এমন এক পরিবেশে ইরানের নারী ফুটবল দলের সদস্যরা যখন অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছান, তখন তাদের সামনে ছিল দুটি পথ—একটি নিজ দেশে ফিরে যুদ্ধের মধ্যেই বেঁচে থাকা, আরেকটি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে নির্বাসিত জীবন। দুটি পথই ছিল অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক।
এই দলটির অনেক সদস্যেরই বয়স ছিল মাত্র একুশ বছর। দলের অধিনায়ক জোহরা গানবারির নেতৃত্বে তারা প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের অবস্থান হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। দলের সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা সরকারের হাতে চাপের মুখে পড়েন। কারণ, ইরানি সরকার তাদের সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা দলের পাঁচ সদস্য—জোহরা গানবারি, ফাতেমেহ পাসানদিদেহ, জোহরা সারবালি, আতেফে রামাজানজাদেহ ও মোনা হামুদিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ ও অভিবাসন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গোপনে প্রক্রিয়াধীন ছিল।
কিন্তু ইরানি সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। ফলে দলের অধিকাংশ সদস্য দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন। মাত্র দুজন সদস্য—আতেফে রামাজানজাদেহ ও ফাতেমেহ পাসানদিদেহ অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যান। তাদের অবস্থান নিয়ে সমগ্র বিশ্বে আলোচনার ঝড় ওঠে। ইরানি সরকার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাদের ফুটবলারদের ‘অপহরণের’ অভিযোগ তোলে। কিন্তু আসলে খেলোয়াড়দের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনাই ছিল ইরান সরকারের লক্ষ্য।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরানের নারী ফুটবল দলের সদস্যরা স্বাধীনতার স্বপ্নের জন্য যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তা বিশ্ববাসীর সামনে উঠে আসে। তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল রাজনীতির একটি অংশ। যুদ্ধ আর দমন-পীড়নের মধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা আর স্বপ্নকে ধরে রাখার এই সংগ্রাম শুধু ক্রীড়াঙ্গনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা পরিণত হয়েছে মানবাধিকার আর স্বাধীনতার এক নতুন অধ্যায়ে।
মন্তব্য করুন