ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নির্ধারিত ‘পেমবার্টন লাইন’ ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু সেই সীমান্তের দুই পাশেই বাস করে একই জনজাতির মানুষ—নাগা, কুকি, চিন। স্বাধীনতার পরেও তারা অবাধে চলাচল করতেন, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকারের কঠোর সীমান্ত নীতি সেই স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে।
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির মূল ভিত্তি ছিল মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগ স্থাপন। কিন্তু সীমান্ত অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সেই উদ্যোগকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। স্থানীয় জনজাতিগুলো যেমন নিজেদের ভূখণ্ড হারানোর বেদনা বহন করছে, তেমনি ভারত সরকারও মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল ঠেকাতে কাঁটাতারের প্রাচীর নির্মাণ করছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের আন্তঃসীমান্ত জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে।
সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর মধ্যে মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল মিয়ানমারের সাথে সরাসরি সীমান্ত ভাগ করে। এসব রাজ্যে বসবাসরত খ্রিস্টান জনজাতির মানুষরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু সরকারের কঠোর সীমান্ত নীতি সেই ঐতিহ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নাগাল্যান্ডের নাগা জনজাতি বা মণিপুরের কুকিরা এখন নিজেদের ভূমিতে পরবাসীর মতো অনুভব করছেন।
মিয়ানমারের চিন রাজ্যের ফালাম শহরটি মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিজোরামের রিহ-দিল হ্রদের কারণে পর্যটকদের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন সেই হ্রদেও যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। ভারত সরকার তাদের তালিকাভুক্ত করে পর্যবেক্ষণে রাখছে, যার ফলে স্থানীয় জনজাতিদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত সরকারের সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে ভারত চায় মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু এর ফলে স্থানীয় জনজাতিদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারও নিজেদের বিরোধীদের দমনে এই সীমান্ত প্রাচীরকে সহায়ক বলে মনে করছে। ফলে দুই দেশের সরকারই নিজেদের স্বার্থে স্থানীয় জনজাতির অধিকারকে উপেক্ষা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো মিয়ানমারের সাথে সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে না তোলা। গত এক দশকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য মাত্র ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যেখানে চীনের অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও সীমান্ত অস্থিতিশীলতার কারণে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের যে স্বপ্ন ছিল, তা অধরাই রয়ে গেছে। ফলে ভারতের পূর্বমুখী নীতির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
স্থানীয় জনজাতিদের নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভারত সরকার তাদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিদেশি বিনিয়োগ ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। অথচ এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যদি স্থানীয় জনজাতির সাথে সমঝোতার মাধ্যমে সীমান্ত নীতিকে পুনর্বিবেচনা না করে, তাহলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও বিপন্ন হবে।
মন্তব্য করুন