ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার নিভৃত গ্রামে বসবাস করেন সাবা ইসলাম নামের এক কিশোরী। তার জীবনের গল্পটি অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ শব্দ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। জন্ম থেকেই তিনি বোবা ও বধির। মুখ ফুটে কথা বলতে না পারলেও, তার হাতের স্পর্শ আর তুলির নিখুঁত ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠছে ক্যানভাসের পর ক্যানভাস। সাবা ইসলাম শুধু নিজের কথা বলছেন না, তিনি তুলির মাধ্যমে নিজের অন্তর্দৃষ্টি আর অনুভূতির কথা জানিয়ে দিচ্ছেন পুরো বিশ্বকে।
সাবার জীবনের এই অসাধারণ যাত্রা শুরু হয়েছিল তার শৈশব থেকেই। যখন অন্য শিশুরা স্কুলে যেতে শুরু করেছিল, তখন তার কাছে জগৎটা ছিল নীরব। কিন্তু তার মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল রংতুলি। ধীরে ধীরে তিনি চিত্রকলায় নিজেকে নিমজ্জিত করেছিলেন। তার প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে উঠেছে প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানবিক আবেগ আর জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত। তার কাজ দেখে এখন অবাক হয়ে যান শিল্পবোদ্ধারা। শুধু তাই নয়, তার প্রতিভা স্বীকৃতি পেয়েছে অসংখ্য পুরস্কারের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত তিনি পেয়েছেন কয়েকশো পুরস্কার, যার মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সম্মাননা।
সাবা ইসলামের বাবা মো. জহিরুল ইসলাম একজন সাধারণ কৃষক। তিনি তার মেয়ের প্রতিভা বিকাশে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সাবার মা রোকেয়া আক্তারের ভূমিকাও কম নয়। তিনি সাবাকে সবসময় উৎসাহ দিয়ে গেছেন। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, সাবা যখন ছোট ছিল, তখন থেকেই তার মধ্যে শিল্পের প্রতি অদ্ভুত এক টান ছিল। তার হাতের ছোঁয়ায় ক্যানভাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠতো। পরিবারের সদস্যরা তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন, যাতে তিনি নিজেকে আরও উন্নত করতে পারেন।
সাবা ইসলামের চিত্রকলার বিষয়ে তার শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সাবা একজন অসাধারণ প্রতিভাবান শিল্পী। তার কাজে ফুটে ওঠে জীবনের বিভিন্ন দিক, যা দর্শকদের মনকে স্পর্শ করে। তার তুলির ছোঁয়ায় যেন কথা বলে ওঠে ক্যানভাস।” তিনি আরও জানান, সাবা ক্লাসে সবসময় মনোযোগ দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তার কাজের প্রতি তার অদম্য উৎসাহ দেখে সবাই মুগ্ধ হন।
সাবা ইসলামের চিত্রকলার কাজ শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় তার কাজ প্রদর্শন করেছেন। তার কাজের প্রদর্শনী হয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশেও। তার কাজ দেখে বিদেশী দর্শকরাও মুগ্ধ হন। তার কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের নাম বিশ্ব দরবারে তুলে ধরছেন।
সাবা ইসলামের জীবনের এই অসাধারণ গল্প শুনে অনেকেই অনুপ্রাণিত হন। তার জীবনে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন তার পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুরা। তিনি এখন শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। তার কাজের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রতিবন্ধকতা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং তা হতে পারে জীবনের অন্যতম চালিকা শক্তি।
বর্তমানে সাবা ইসলাম তার উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং একই সাথে তার চিত্রকলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার কাজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্যালারিতে প্রদর্শিত হবে। তার এই স্বপ্ন পূরণে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তার পরিবার ও শিক্ষকরা তাকে সবসময় সহযোগিতা করছেন। সাবা ইসলামের জীবনের গল্প শুনে অনেকেই অনুপ্রাণিত হন এবং তার মতো করে জীবনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে অনুপ্রাণিত হন।
মন্তব্য করুন