যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ এখন বিরল মৌলিক পদার্থের (রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস) মধ্য দিয়ে একটি নতুন মাত্রায় উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের প্রযুক্তি বিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি এই বিরল মৌলগুলো ছাড়া আধুনিক যুগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে পড়বে। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে রোবটিক্স, যুদ্ধবিমান, এমনকি সামরিক ড্রোন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় এই বিরল মৌলগুলো। অথচ একমাত্র চীনই এখন বিশ্ববাজারে এই পদার্থগুলোর প্রায় একচেটিয়া সরবরাহকারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন চেষ্টা করছে নিজেদের বিরল মৌলের উৎস খুঁজে বের করে এই নির্ভরতা কমাতে।
এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র সক্রিয় বিরল মৌলের খনি, যেটি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাউন্টেন পাস নামক এই খনিটি ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার জন্য মার্কিন সরকার ও ব্যবসায়ী মহল নতুন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে, চীনও এই বিরল মৌলের রফতানি নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল মৌলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশ্বের প্রযুক্তি ও সামরিক খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ এই পদার্থগুলো ছাড়া ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিই সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান খনিটি থেকে বছরে প্রায় ২০-৩০ হাজার টন বিরল মৌল উৎপাদন করা সম্ভব হলেও তা চীনের তুলনায় অনেক কম। চীন বছরে প্রায় ১ লাখ টন বিরল মৌল উৎপাদন করে এবং বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা মেটায়।
এই সংকটের মধ্যেই মার্কিন সরকার বিরল মৌলের উৎপাদন বাড়াতে নতুন খনি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এই খাতে চীনকে টেক্কা দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ বিরল মৌলের খনি থেকে উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। অন্যদিকে, চীন ইতিমধ্যে এই খাতে নিজেদের দক্ষতা ও অবকাঠামোকে অনেক উন্নত করেছে। ফলে মার্কিনিদের জন্য পিছিয়ে থাকা প্রতিযোগিতায় ফিরে আসা সহজ হবে না।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই বিরল মৌলের সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ দেশগুলোও প্রযুক্তি খাতে নিজেদের উন্নয়নের জন্য এই পদার্থগুলোর উপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সংকট আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, কারণ তাদের কাছে নিজেদের উৎস তৈরির মতো প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সামর্থ্য নেই। ফলে বিশ্ববাজারে বিরল মৌলের দাম বাড়লে তা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বকে এখনই বিরল মৌলের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। নয়তো আগামী দিনে প্রযুক্তি বিপ্লব থেমে যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যদি নিজেদের উৎস তৈরির দিকে মনোনিবেশ করে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে এই সংকট কিছুটা হলেও কমবে। তবে তা কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মন্তব্য করুন