সময় বদলে গেছে। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা আর ব্যয়বহুল জীবনের চাপে দুই অভিভাবকের জন্য পরিবারের সবাই মিলে একত্রে রাতের খাবার খাওয়া হয়ে উঠছে একটি বিরল ঘটনা। বিশেষ করে যখন পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন, তখন এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু এমন অনেক পরিবার আছে যারা নিজেদের মতো করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন। এমনই একটি পরিবারের কথা জানাচ্ছেন একজন অভিভাবক, যিনি নিজের স্বামীর সাথে মিলে খুঁজে নিয়েছেন এক অভিনব সমাধান।
এই দম্পতি দুজনই কর্মজীবী। চার সন্তানের জননী জানাচ্ছেন, রান্নাঘরের কাজে তাদের দুজনের স্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা। একজন অত্যন্ত সংগঠিত প্রকৃতির, অন্যজন নিয়মতান্ত্রিক। দুইজনই আলাদা আলাদা ভাবে রান্নার কাজ করলে তা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তারা বেছে নিয়েছেন ভিন্ন উপায়। একজনের দায়িত্ব খাবারের পরিকল্পনা করা আর অন্যজনের দায়িত্ব বাজার করা। এর ফলে তাদের পারিবারিক সময়ও হয়ে উঠছে আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল।
পরিবারের খাবারের পরিকল্পনা করার দায়িত্বটি মূলত স্ত্রীর উপর। তিনি একটি চার সপ্তাহের মেনু তৈরি করেছেন যেখানে পরিবারের সদস্যদের পছন্দ-অপছন্দ এবং স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করে খাবার নির্বাচন করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিনের সেই চিরাচরিত প্রশ্ন ‘আজ রাতে কি খাব?’ থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে। স্ত্রী জানাচ্ছেন, তারা সাধারণত সপ্তাহে চার থেকে পাঁচবার রান্না করেন। কখনো কখনো একই খাবার দুই রাত খাওয়া হয় যাতে কাজের চাপ কম থাকে। আর সপ্তাহান্তে শুক্রবারের রাতের খাবারটাই পরের দিন বিকেলের লাঞ্চ হিসেবে কাজে লাগে।
অন্যদিকে, স্বামীর দায়িত্ব হলো বাজার করা। স্ত্রীর জন্য বাজার করা মানেই যেন এক দুঃস্বপ্ন। আলো-আঁধারি দোকান, মানুষের ভিড় আর অন্যের ব্যক্তিগত জায়গায় হস্তক্ষেপ করার মতো ঘটনা তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। কিন্তু তার স্বামীর কাছে এটি একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। তিনি ইয়ারবাড লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে বাজার করেন। স্ত্রী বলছেন, তার স্বামীর কাছে বাজার করা যেন এক ধরনের ধনসম্পদ খুঁজে পাওয়া। তিনি বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে খাবার নিয়ে আসেন এবং সন্তানরাও সেই জিনিসগুলোকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে ফ্রিজে রাখতে সাহায্য করে।
শিশুদেরও এই রান্নার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে দুজন প্রত্যক্ষভাবে রান্নায় সাহায্য করে। তাদের প্রত্যেকে সপ্তাহে এক বা দুই দিন ‘ফুড হেল্পার’ হিসেবে কাজ করে। তারা টেবিল সাজানো, খাবারের সরঞ্জাম বের করা এবং সবজি কাটা থেকে শুরু করে ওভেন চালু করার মতো কাজগুলো করে। স্ত্রী জানাচ্ছেন, রান্নাঘরে স্বামীর উপস্থিতি তার কাছে বিরক্তিকর। তাই তিনি যখন রান্না করেন, তখন স্বামীকে রান্নাঘর থেকে বের করে দেন। আবার যখন স্বামী রান্না করেন, তিনিও নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এর ফলে দুজনের মধ্যে কোনোরকম ঝগড়া বা বিরক্তির সম্ভাবনা কমে যায় এবং সন্তানদের সাথে একান্ত সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি হয়।
এই ব্যবস্থা তাদের জন্য বেশ কাজে দিয়েছে। তারা প্রতিদিন রাতের খাবার একত্রে খেতে পারেন না। তাদের মধ্যে একজন কিশোর সন্তান সন্ধ্যায় কাজ করে থাকে, আবার দুজন সন্তান খেলাধুলার সাথে যুক্ত থাকায় তাদের সময়সূচিও আলাদা। কখনো কখনো স্বামীর অফিসের কাজ দেরি হয়ে যায়, আবার কখনো কেউ সন্তানদের খেলাধুলার জায়গায় নিয়ে যেতে ব্যস্ত থাকেন। তাই তারা সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার পরিবারের সবাই মিলে একত্রে খেতে পারেন। কিন্তু বিভিন্ন কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়ার ফলে তাদের সন্ধ্যার সময়গুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। তারা নিজেদের দিনের ঘটনা শেয়ার করেন, একে অপরের সাথে সময় কাটান এবং বাইরের চাপ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন।
মন্তব্য করুন