ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে রয়ে গিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে। ইতোমধ্যেই থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের দেশবাসীকে তেল সাশ্রয়ের জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসীকে তেল সাশ্রয়ের জন্য ১০টি পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অফিসে কাজের বদলে ঘরে বসে কাজ করা, বিমান ভ্রমণ কমানো, ইলেকট্রিক কুকার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি অপ্রয়োজনীয় যাত্রা বন্ধ করা। এছাড়া গাড়ি চালানোর গতি কমিয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলো তেল সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। থাইল্যান্ড সরকার জনগণকে তেল মজুদ না করতে সতর্ক করেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, ঘরে তেল মজুদ করা বিপজ্জনক হতে পারে। একইসঙ্গে সরকার জ্বালানি তেলের দাম ১৫ দিনের জন্য স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি এয়ারকন্ডিশনার কক্ষের তাপমাত্রা ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালু না হলেও কয়েকটি রাজ্যে কিছু পেট্রোল পাম্পে গ্রাহকদের তেলের পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিমন্ত্রী ক্রিস বাউয়েন জানিয়েছেন, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি না থাকলেও চাহিদা বৃদ্ধির কারণে কিছু সরবরাহজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইউরোপে স্পেন সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব প্রশমিত করতে ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্যাকেজে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভ্যাট কমানো থেকে শুরু করে পরিবহণ খাতের জন্য জ্বালানি ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
জাতিসংঘের জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, যেসব দেশ তেলের উপর বেশি নির্ভরশীল, তারা এই সংকটের প্রভাব বেশি অনুভব করবে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানে এখনই তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছে। ভারত সরকার ইতোমধ্যেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহকে শিল্পখাত থেকে সরিয়ে ঘরবাড়ির দিকে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা নিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন স্থগিত করা হয়েছে এবং সরকারি ব্যয় ২০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি দেশটিতে স্কুলগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রমজান উপলক্ষে ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কমানো হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিশরে রাতের দোকানপাট ও রেস্তোরাঁগুলোকে রাত নয়টায় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সরকারি অফিসগুলোকে সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জার্মানিতে তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নিয়ম জারি করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, জার্মানির পেট্রোল স্টেশনগুলো দিনে একবারই তেলের দাম বাড়াতে পারবে। এছাড়া সরকার তেল সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য নিজস্ব তেল মজুদ ভাণ্ডারও ছেড়ে দেবে বলে জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সরকার ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় তেল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেননা, জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দেশের অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্তব্য করুন