যশোর সদর উপজেলার বারীনগর পাইকারি সবজি মোকাম। এখানেই গড়ে উঠেছে তিন প্রজন্মের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আতিয়ার রহমান নামের এক উদ্যোগী ব্যবসায়ী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মোকামকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বাধীনতার স্বপ্ন। তাঁর বাবা মহির উদ্দিন বিশ্বাসও একসময় ছিলেন এখানকারই দিনমজুর শ্রমিক। নিজের শ্রম আর দৃঢ় সংকল্পের জোরে আতিয়ার এখন নিজের পরিবারকে নিয়ে গর্বিতভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দুই ছেলে রবিউল ইসলাম ও রোকনুজ্জামানও এখন তাঁর ব্যবসার হাল ধরেছেন। এই তিন প্রজন্মের হাত ধরেই বারীনগর মোকাম আজ পরিচিত এক সফল ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে।
শুরুটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। নিরক্ষর আতিয়ার তাঁর জীবনের প্রথম দশকগুলো কাটিয়েছেন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। বাবার সঙ্গে দিনমজুরি করে পাইকারি মোকামে পানি টানা, সবজি বাছাই আর বস্তায় মুখ সেলাইয়ের কাজ করেছেন বছরের পর বছর। এই কঠিন জীবন তাঁকে শিখিয়েছিল সংগ্রামের মূল্য। কিন্তু তিনি হার মানেননি। নৈশ বিদ্যালয়ে গিয়ে অক্ষরজ্ঞান অর্জন করে নিজের নাম লেখার পাশাপাশি ব্যবসার হিসাব-কিতাবও সামলাতে শিখেছেন তিনি। তাঁর কষ্টের ফসল আজ দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই নির্মাণ করা ছয় শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা চার হাজার বর্গফুটের পাকা বাড়িতে। দুটি ট্রাক তাঁর ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত। প্রতিদিন অন্তত বিশজন শ্রমিক তাঁর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে উপার্জন করে নিচ্ছেন।
আতিয়ারের জীবনের উত্থান কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্বও বটে। তিনি যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল প্রকট। এরশাদ সরকারের শেষ দিকের বছরগুলোতে যখন হরতাল আর পরিবহন বিপর্যয় চলছিল, তখনও তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বিআরটিসির গাড়িতে চেপে তিনি সবজি নিয়ে যেতেন খুলনার আড়তে। সেই সময়েই তিনি প্রচুর লাভ করেছিলেন। এক বছরের ব্যবধানে তিনি পঞ্চাশ থেকে ষাট লাখ টাকা আয় করেন। সেই অর্থেই তিনি কিনেছিলেন তাঁর প্রথম জমি, গড়ে তুলেছিলেন বাড়ি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়ের লাভের টাকা দিয়েই তিনি দুইটি ট্রাক কেনার ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি সেই ট্রাকের কিস্তিও তিনি পরিশোধ করে ফেলেছেন।
তাঁর দুই ছেলের শিক্ষা আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি তাঁদের নিজের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বড় ছেলে রবিউল ইসলাম যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি এসিআই কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল তিনি ব্যবসা দেখাশোনা করুক। এখন রবিউল ব্যবসার হিসাব রাখছেন আর তাঁর ছোট ভাই রোকনুজ্জামান উচ্চমাধ্যমিক পাস করে স্নাতক স্তরে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েকে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে বিবাহ দিয়েছেন, মেজ মেয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে আর ছোট মেয়ে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে। তাঁর সন্তানদের শিক্ষা আর স্থিতিশীল জীবনের স্বপ্নই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তবে আতিয়ার জানেন, ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এখন আগের মতো সহজ নয়। প্রতিদিন তিনি দুই থেকে তিন লাখ টাকার ব্যবসা করেন ঠিকই, কিন্তু প্রতিযোগিতা আর প্রতিবন্ধকতা তাঁর সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাইকারি মোকামে খাজনা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ তাঁকে বহন করতে হয়। তিনি বলেন, ‘নতুন কেউ যদি এই ব্যবসায় আসতে চায়, তাকে অবশ্যই প্রচুর পরিশ্রম আর ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ এখানে টিকে থাকা সহজ নয়। তবে আমি আমার সংগ্রামের পথ থেকে কখনও পিছপা হইনি। ব্যবসা চালিয়ে যাবই।’ তাঁর এই দৃঢ়তা আর সংগ্রামের গল্প শুধু তাঁর পরিবারকেই নয়, পুরো ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কেই অনুপ্রাণিত করছে। বারীনগর মোকাম আজ শুধু একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র নয়, এটি একটি স্বপ্নপূরণের কেন্দ্রও বটে।
মন্তব্য করুন