টরেন্টোর ব্যস্ত কর্পোরেট জগৎ থেকে বিরক্ত হয়ে নিজের জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন মুরগি চাষে। কানাডার স্কটিয়াব্যাংকের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে ফিলিপাইনে পাড়ি জমিয়েছেন অ্যান্ড্রু ফ্লেচার। তার স্বপ্ন ছিল নিজের ব্যবসা শুরু করা, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু তার এই যাত্রা কেবল শুরুই নয়, বরং একেবারে নতুন জীবনের দিকে পদক্ষেপ।
অ্যান্ড্রু ফ্লেচার জানান, তিনি কানাডার নোভা স্কটিয়া থেকে উঠে এসেছেন। সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর তিনি একটি এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হন। এরপর টরেন্টোতে স্কটিয়াব্যাংকে কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ের চাকরি পান। বছরে প্রায় দেড় লাখ কানাডিয়ান ডলার আয় করলেও তার জীবন ছিল একঘেয়ে। অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ সেই জীবন তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তিনি বলেন, “প্রতিদিন একই কাজ, একই মানুষদের সাথে দেখা। মনে হতো, আমাকে যেকোনো ভবনে রেখে দিলেও আমি একইভাবে কাজ করতাম।”
তার জীবনে পরিবর্তন আসে যখন তিনি তার সঙ্গীর পরিবারের মাধ্যমে ফিলিপাইনের মুরগি চাষের ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত হন। সঙ্গীর পরিবার মূলত পোল্ট্রি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। ফ্লেচার বুঝতে পারেন, এই ব্যবসায় তিনি নিজের অর্থ বৃদ্ধি করতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করতে পারবেন। তিনি বলেন, “আমি ব্যবসার মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে ইতিমধ্যেই অবগত ছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নিজের জীবনকে একেবারে নতুন দিকে নিয়ে যাব।”
আগস্ট মাসে তিনি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অক্টোবরে ফিলিপাইনের কুইজন প্রদেশে চলে আসেন। শুরুতে তিনি একটি ছোট মুরগির খামার ভাড়া নেন, যেখানে একসঙ্গে প্রায় পনের হাজার মুরগি পালন করা যায়। কিন্তু মুরগি পালনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা বই ছিল না। তিনি জানান, অনলাইনে কোনো শিক্ষামূলক সম্পদ না পেয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা এবং দুইজন কর্মচারীর সাহায্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।
মুরগির খামারের দেখভাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “মুরগির পরিচর্যা একটি চব্বিশ ঘণ্টার কাজ। খামারের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে যায় বা পাখা বিকল হয়ে যায়, তাহলে পুরো খামারের মুরগি মারা যেতে পারে।” তিনি প্রায়ই ভোর চারটায় খামারে যান, মুরগিদের খাবার দেওয়া, আবর্জনা পরিষ্কার করা এবং শত শত কিলো ওজনের খাবারের বস্তা বহন করেন।
ফিলিপাইনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। তিনি জানান, এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসাই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। অফিসে তিনি এক্সেলের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন, কিন্তু ফিলিপাইনে অনেক বড় বড় খামারেও কোনো কম্পিউটার পাওয়া যায় না। এছাড়াও, দেশটি একটি নগদ অর্থনির্ভর সমাজ হওয়ায় মাসিক খরচ ট্র্যাক করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি জানান, খামার পরিচালনার জন্য তাকে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার কানাডিয়ান ডলার খরচ করতে হয়।
ফিলিপাইনের সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, খাবার এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার কর্মীদের নিয়মিত খাবার সরবরাহ করেন এবং যখন কোনো ঠিকাদার তার বাড়িতে আসে, তখন তিনি তাকে খাবার খেতে দেন। তিনি মনে করেন, উত্তর আমেরিকার মানুষদের উচিত ফিলিপিনোদের মতো মানুষের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “এখানকার মানুষেরা অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ফিলিপিনোদের আতিথেয়তা সত্যিই অতুলনীয়।”
নতুন জীবন শুরু করার পর তাকে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ভাষার বাধা, পরিবারের অভাব এবং শীতকালে তুষার দেখার অভাব তাকে কষ্ট দিচ্ছে। তবে তিনি জানান, এখানে বসবাসের খরচ অনেক কম। মাসে মাত্র পাঁচশো কানাডিয়ান ডলারে তিনি ভালো একটি বাড়িতে থাকতে পারছেন। খাবারের খরচও অনেক কম। তিনি বলেন, “প্রতিদিন প্রায় এক কানাডিয়ান ডলারে তিন বেলা খাওয়া সম্ভব।”
চার মাস হতে চললেও তার ব্যবসা থেকে এখনো কোনো লাভ আসেনি। তবে তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “হয়তোবা কোনো মাস খুব খারাপ যেতে পারে, কিন্তু যদি পাঁচ বা দশ বছর পর ব্যবসার উন্নতি হয়, তাহলে সেটাই সাফল্য।” তিনি আরও বলেন, “যদি সবকিছু ভেঙে পড়ে, তাহলেও কোনো দুঃখ থাকবে না। অন্তত আমি চেষ্টা করেছিলাম।”
মন্তব্য করুন