ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমিত হওয়ার ফলে দেশবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তারই মধ্যে অনুকূল আবহাওয়া আর পবিত্র ঈদের আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়েছে রাজধানীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র জাতীয় চিড়িয়াখানায়। ঈদের তিন দিনে সাড়ে চার লাখ মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চিড়িয়াখানার বিস্তৃত প্রাঙ্গন। জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের তুলনায় এবার ঈদুল ফিতরের দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ঈদের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ রোববার চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়, যা গত বছরের একই দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, এবার ঈদের প্রথম দিন অর্থাৎ রোজার ঈদের দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় আশি হাজার। দ্বিতীয় দিনেই তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ নব্বই হাজারেরও বেশি। আর তৃতীয় দিন অর্থাৎ গতকাল সোমবার চিড়িয়াখানায় এসেছিলেন প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার মানুষ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রথম দিনের দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও পরবর্তী দুই দিনে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিচালক মহোদয়ের মতে, প্রথম দিন বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে অনেকে বাইরে বের হননি। তবে পরদিন থেকে অনুকূল আবহাওয়া দর্শনার্থীদের স্বস্তি দিয়েছে।
চিড়িয়াখানার প্রবেশপথ থেকে শুরু করে হরিণের খাঁচা, হাতির প্রদর্শনী এলাকা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। মিরপুর-১ নম্বরের সনি সিনেমা হল এলাকা থেকে মানুষের স্রোত সরাসরি চিড়িয়াখানার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। অনেক পরিবারই যানবাহনের ভিড় এড়াতে হেঁটেই যাতায়াত করছেন। ষাটোর্ধ্ব আবুল বাশার নিজেই উত্তরা থেকে ছয়-সাতজন নিয়ে হেঁটে চিড়িয়াখানায় পৌঁছান। তাঁর ভাষায়, ‘আনন্দ করতে গেলে তো একটু কষ্ট করতেই হয়।’ দীর্ঘ ঘোরাঘুরির পর ক্লান্তিতে শিশুদের বিশ্রাম নিতে দেখা যায় বাবার কাঁধে মাথা রেখে।
চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। এদিন পুরান ঢাকা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আসা আলী আজগরের ছেলে সামিউল আহমেদ বেশিরভাগ সময়ই কাঁধে চড়ে ঘুরেছেন। তাঁর মেয়ে উষা মণি প্রথমবারের মতো জাতীয় চিড়িয়াখানা দেখে উচ্ছ্বসিত। সে জানায়, হাতি, বাঘ, সিংহসহ বিভিন্ন প্রাণীকে বাস্তবে দেখার সুযোগ পেয়ে সে আনন্দিত।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামীকাল মঙ্গলবার দর্শনার্থীর চাপ কিছুটা কমতে পারে। কারণ, সরকারি অফিস খুলে যাওয়ার কারণে মানুষ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করবে। তবে স্বাধীনতা দিবসের ছুটির কারণে আগামী ২৬ মার্চ দর্শনার্থীর সংখ্যা আবার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ উপলক্ষে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের সুষ্ঠুভাবে প্রবেশ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার এই বিশাল জনসমাগম দেশের মানুষের জীবনে আনন্দের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর অনুকূল আবহাওয়া মিলিয়ে ঈদের ছুটির এই তিন দিনে শহরের জীবনে এক বিরল আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দর্শনার্থীরা নিজেদের মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন, যা শহরের ব্যস্ত জীবনে এক অনন্য অনুভূতি এনে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন