পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দময় মুহূর্তে দেশের লাখ লাখ মানুষ কর্মস্থল থেকে নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই সময় নৌপথ হয়ে ওঠে সবচেয়ে ব্যস্ত জনপথ। তবে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিও যেন সেই আনন্দকে বিষিয়ে তুলছে। ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওতে দেখা যায় দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষ, যাত্রীদের নদীতে পড়ে যাওয়া এমনকি লঞ্চডুবির মতো ভয়াবহ দৃশ্য। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ভিডিও আদতে কোনো বাস্তব ঘটনার চিত্র নয়—বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে ‘Launch Capture’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায় দুটি লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে যাত্রীরা পানিতে ছিটকে পড়ছেন। অন্য ভিডিওগুলোতে রয়েছে লঞ্চডুবির দৃশ্য, ঘূর্ণিস্রোতের মধ্য দিয়ে লঞ্চের বিপজ্জনক যাত্রা, এমনকি যাত্রীদের আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্ত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব ভিডিও লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছেন। তবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, এসব ভিডিও তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে শক্তিশালী এআই টুল। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, ভিডিওগুলোর গতিবিধি, যাত্রীদের নড়াচড়া ও পানির ঢেউয়ের অস্বাভাবিকতা এআই নির্মিত কনটেন্টের বৈশিষ্ট্যের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এমনকি এআই ডিটেকশন টুলগুলোও এসব ভিডিওকে এআই নির্মিত বলে চিহ্নিত করেছে, যার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
এই ভুয়া ভিডিওগুলোর পেছনে রয়েছে ‘Launch Capture’ নামে একটি ফেসবুক পেজ, যার অনুসারী সংখ্যা প্রায় চার লাখ তেত্রিশ হাজার। পেজটির বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটি মূলত রিল নির্মাতা হিসেবে পরিচিত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পেজের পুরোনো নাম ছিল ‘Buchugang’, যা ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে নাম পরিবর্তন করে ‘Launch Capture’ রাখা হয়। পেজটি পরিচালনা করছেন বাংলাদেশ থেকে দুই ব্যক্তি। এই পেজ থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ ভিডিওই লঞ্চ ও লঞ্চঘাট কেন্দ্রিক। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই পেজ থেকে প্রকাশিত ভিডিওগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই এআই দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে ‘দুই লঞ্চের সংঘর্ষ দেখুন’, ‘ঘূর্ণিস্রোত অতিক্রম করছে লঞ্চ’, এমনকি ‘ফেরি ঘাটে ভেড়ার সময় যা ঘটল’। কিন্তু কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে এগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা। ফলে সাধারণ মানুষ এসব ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ঈদযাত্রার মতো সংবেদনশীল সময়ে এ ধরনের ভুল তথ্য মানুষের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি নৌপরিবহন অধিদপ্তর বা সরকারি কোনো সূত্র থেকেও এ ধরনের কোনো দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতি ব্যবহারযোগ্যতা এবং তথ্য যাচাইয়ের অভাবের কারণে এ ধরনের ভুয়া কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তারা সতর্ক করেছেন যে, ভুয়া সংবাদ বা ভিডিও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং এমনকি সামাজিক বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কোনো তথ্য গ্রহণ করার আগে তা সঠিকভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে যাতে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
মন্তব্য করুন