২০২৬ সালের প্রথম তিন মাস পার হয়ে গেলেও কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকা থেমে নেই। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি, মিডিয়া, অর্থনীতি ও খুচরা ব্যবসার মতো বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সরকারি নীতিমালা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই চলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ কোম্পানি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে দেবে, যার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এআই-এর প্রভাব। গত বছর প্রায় ৬৫টি বড় কোম্পানিতে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
মার্চ মাসের শেষের দিকে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা তাদের কর্মীদের ছাঁটাই শুরু করেছে। কোম্পানির মেটাভার্স প্রকল্পের জন্য দায়ী রিয়্যালিটি ল্যাবস সহ বিভিন্ন বিভাগে ব্যাপক কর্মী হ্রাস করা হচ্ছে। একই সময়ে অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রায় ১৬ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করছে, যা কোম্পানির দ্বিতীয় বড় ধরনের কর্মী হ্রাস। অন্যদিকে, অ্যাটলাসিয়ান নামে একটি সফটওয়্যার কোম্পানি তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে দেবে বলে ঘোষণা করেছে। এছাড়া ক্রিপ্টো ডট কম, ডেল, ইবের মতো কোম্পানিও কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে।
এর মধ্যে অ্যাঙ্গি নামক প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ৩৫০ জনকে ছাঁটাই করেছে বলে জানা গেছে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, এআই ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যদিকে, ইপিক গেমস তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশকে ছাঁটাই করছে বলে ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী টিম সুইনি জানান, এই ছাঁটাই এআইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং গেমটির জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণে হয়েছে।
পিনটারেস্ট নামক সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশকে ছাঁটাই করছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র জানান, তারা এআইভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য কর্মী সংখ্যা কমিয়ে দেবে। একইভাবে, ভার্জিন গ্রুপের মালিকানাধীন ক্রিপ্টো ডট কম তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশকে ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ক্রিস মারশালেক জানান, এআই সক্ষম কর্মীদের সঙ্গে যারা খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তাদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির প্রভাব কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে কর্মীদের মানসিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে কোম্পানিগুলো দাবি করছে, এই পরিবর্তন তাদের দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট নামক খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ৫০০ জনকে ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটির নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফিডেলকে জানান, তারা তাদের বিতরণ কেন্দ্র ও আঞ্চলিক অফিসগুলোকে আরও দক্ষ করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একইভাবে, ইউপিএস নামক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মী সংখ্যার প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তারা কর্মী সংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে তাদের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করবেন।
বাংলাদেশেও কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মী সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন