যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকায় দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ঋণের ভার বর্তমান সময়েই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যেও বিশাল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রিপাবলিকানদের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অর্থনৈতিক কমিটি (জেইসি) ইতিমধ্যেই দেশটির ঋণ ব্যবস্থাকে ‘অস্থিতিশীল’ বলে ঘোষণা করেছে। তারা মনে করেন, এই সংকটকে উপেক্ষা করা ‘অবৈধ’ ও ‘অনৈতিক’ কাজ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতারা এই বিবৃতিকে সমর্থন করেছেন। হেজ ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণজনিত সমস্যা একটি ‘হৃদরোগের আক্রমণের’ মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অন্যদিকে জেপি মরগ্যান চেজের সিইও জেমি ডিমন দেশটির ঋণ বৃদ্ধিকে ভূমিকম্পের মতো দুটি প্রধান বিপদের একটি বলে বর্ণনা করেছেন।
ঋণের সমস্যার মূল কারণ হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরকারের ঋণ পরিশোধের বোঝাও অসহনীয় হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গত অর্থবছরে শুধুমাত্র সুদ হিসেবেই প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে এই সুদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারে।
ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য আরও উদ্বেগজনক। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দায়দেনা এখন তার সম্পত্তির চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ স্টিভ হানকি এবং সাবেক কম্পট্রোলার জেনারেল ডেভিড এম ওয়াকারের মতে, কোনো হিসাবেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ‘অসমর্থ’ বলা যায়। তারা ফরচুন ম্যাগাজিনে লিখেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ারের মতো অফ-ব্যালেন্স শিটের দায়দেনা যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দায়দেনার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। তারা সিদ্ধান্তে আসেন যে, কংগ্রেস ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
এরপরও সরকারের কিছু প্রস্তাবিত সমাধান রয়েছে। মিশিগানের রিপাবলিকান প্রতিনিধি বিল হুইজেনগা একটি দ্বipartisan অর্থনৈতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছেন। এই কমিশনের কাজ হবে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ সুপারিশ করা। অন্যদিকে হাউস বাজেট কমিটির চেয়ারম্যান জোডি অ্যারিংটন একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রস্তাব করেছেন, যার মাধ্যমে সরকারকে বার্ষিক বাজেট ভারসাম্য রাখতে বাধ্য করা হবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রস্তাবগুলো কার্যকর হতে পারে না। কারণ ইতিহাস সাক্ষী যে, এই ধরনের কমিশন প্রায়শই রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে এবং তাদের সুপারিশগুলো কংগ্রেস প্রায়ই উপেক্ষা করে। বস্টন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক লরেন্স কোটলিকফ মনে করেন, এই ধরনের কমিশন শুধুমাত্র সমস্যার উপর আলোকপাত করবে, সমাধান দিতে পারবে না। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা নিজেরাই সমস্যার অংশ হয়ে উঠেছেন। ফলে তাদের কাছ থেকে কার্যকর সমাধান পাওয়া মুশকিল।
অন্যদিকে, কঠোর বাজেট নিয়ন্ত্রণের ফলে অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকারকে ব্যয় কমাতে বা কর বৃদ্ধি করতে বাধ্য করা হতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক মন্দা আরও গভীর হতে পারে। জার্মানির ‘ডেট ব্রেক’ নামক সাংবিধানিক বিধিনিষেধের ব্যর্থতার উদাহরণ তুলে ধরে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, অত্যধিক কঠোর বিধিনিষেধ অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যে কোনো সময়ে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। এই সংকট সমাধানে রাজনীতিবিদদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাময়িকভাবে ব্যয় কমানো বা কর বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে এই ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে এবং জনগণের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
মন্তব্য করুন