ProbasiNews
২৬ মার্চ ২০২৬, ৯:২২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভাইরাল হওয়া আমার বেকারিকে বাঁচিয়েছিল, কিন্তু কখনোই অর্থের জন্য নয়

ব্রুকলিনের বিড়স্টু এলাকায় অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র বেকারি ‘জে টেম প্যাটিসারি’। এর স্বত্বাধিকারী ও প্রধান শেফ হলেন জেটি কিয়ার্সলি। নিজের বেকারিকে তিনি এখানে একটি অনন্য স্বাদে উপস্থাপন করেছেন—ফরাসি পেস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত করেছেন ব্ল্যাক গার্ল সংস্কৃতি। কিন্তু কখনোই তিনি অর্থকেই তাঁর লক্ষ্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া তাঁর বেকারির কথা, তাঁর কাজের স্বীকৃতি। আর সেই মুখরোচক খবরই তাঁকে নিয়ে এল মহাসমুদ্রের কাছে।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাস। জেটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তখন মাত্র দুই হাজার ডলার। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মতো অর্থ পর্যন্ত ছিল না তাঁর কাছে। নিজের বেকারি চালু করার এক বছর আগে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন, নিজের সঞ্চয়ও ব্যয় করেছিলেন। ছোট ব্যবসার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন—ভাড়া, উপাদান, কর্মচারীদের বেতন, বীমা, কর—সবই তাঁর জানা ছিল। কিন্তু নিজের দোকানে বসে যখন তিনি উপলব্ধি করলেন যে পরদিন কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়, তখনই তাঁর জীবনে চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এল।

ঠিক পরের দিনই এল সেই পরিবর্তন। ‘রাইটিয়াস ইটস’ নামে একটি সামাজিক মাধ্যম ফিডে তাঁর বেকারি নিয়ে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল। নিউইয়র্কের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ নিয়ে কাজ করা এই ফিডটি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জেটির বেকারি নিয়ে সেই ভিডিওটি যখন সকলের সামনে এল, তখন তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। ব্যবসায়ীরা তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়লেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তা যে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।

ভাইরাল হওয়ার পর তাঁর ব্যবসা যেমন বেড়ে গেল, তেমনি তাঁর কাজের চাপও বহুগুণ বেড়ে গেল। স্বাভাবিক সময়ে তাঁরা সপ্তাহে গড়ে দুইশো ক্রোইসাঁ তৈরি করতেন। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পর এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল দেড় দিনে দুইশো ক্রোইসাঁ। তাঁর দলের সদস্য সংখ্যা ছিল চার। কিন্তু সেই চাহিদা মেটানোর জন্য তাঁকে পরিবারের সদস্য, বন্ধু এমনকি স্বেচ্ছাসেবীদেরও সাহায্য নিতে হয়েছিল। সকাল ছয়টায় দোকানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে কাজ শুরু করতে হতো। কখনো কখনো একাই তাঁকে ক্রোইসাঁ তৈরির কাজ করতে হয়েছে। এমনকি ছুটির দিনেও তাঁকে ক্রোইসাঁ তৈরির কাজ করতে হয়েছে, কারণ আর কেউ ছিল না।

ভাইরাল হওয়ার ফলে আরও একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। মানুষ তাঁর দোকানে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা দেখতেন দোকান পূর্ণ হয়ে গেছে। তিনি কারো মন খারাপ করতে চাননি। তাই ভাইরাল হওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে তিনি দোকানের বেঞ্চিতেই ঘুমিয়েছেন, যাতে চাহিদা মেটাতে পারেন।

ভাইরাল হওয়ার ফলে মানুষের মতামতও তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর দাম নিয়ে, তাঁর এলাকার মান নিয়ে, এমনকি ইলেকট্রনিক বেনিফিট ট্রান্সফার (ইবিটি) গ্রহণ করার কারণেও অনেকে তাঁর সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু জেটির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর এলাকার মানুষ। বিড়স্টু যে এলাকা সবসময়ই অবহেলিত, খাদ্য মরূদ্যানহীন একটি এলাকা—সেখানে তিনি তাঁর বেকারিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি ইবিটি গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তিনি চেয়েছিলেন যেন তাঁর দোকানে যে কেউ আসতে পারেন, তাঁদের সামর্থ্য যাই হোক না কেন। তাঁর কাছে অর্থই মুখ্য ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন তাঁর দোকানে এসে খুশি হয়ে ফিরে যান। তাঁর এই দোকান তাঁর কাছে শুধু ব্যবসা নয়, একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক।

তিনি স্বীকার করেন যে তাঁর ব্যবসা চালানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সাহায্য করা, তাঁদের সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা। অর্থ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বটে, কিন্তু তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষের মুখে মুখে নিজের কাজের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, ‘আমি যদি শুধু অর্থের জন্যই এই ব্যবসা চালাতাম, তাহলে হয়তো আমি দাম আরও বেশি রাখতাম, একক মায়ের কাছে ক্রোইসাঁ বিক্রি করার কথা ভাবতাম না। এমনকি বিড়স্টুর পরিবর্তে ম্যানহাটনে দোকান খুলতাম। কিন্তু আমি বিড়স্টুতেই দোকান খুলেছি ইচ্ছাকৃতভাবে। আমি চেয়েছিলাম এমন একজন মানুষ যিনি কখনোই তাজা ক্রোইসাঁ বা কুইশ খাননি, তাঁর কাছে আমার দোকানটি এমন এক অনুভূতি জাগিয়ে তুলুক যেন তিনি সেই স্বাদ পাওয়ার যোগ্য।’

এই কথাগুলোই তাঁর ব্যবসার মূলমন্ত্র। অর্থ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তাঁর কাছে মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তিনি বলেন, ‘আমি যদি ব্যবসা চালাতে অর্থ না করেও পারতাম, তাহলে তা-ই করতাম। কিন্তু নিউইয়র্ক শহরে তা সম্ভব নয়। তবে আমার আবেগ সবসময়ই ছিল মানুষকে সাহায্য করা এবং আমার এলাকাকে আরও সুন্দর করে তোলা।’

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হারভে কেন ওপেনএআইয়ের মতোই তুলছে বিপুল অর্থ? আইনশিল্পে বিপ্লবের লক্ষ্যে হারভের অভিযান

এআই বিপ্লবে নতুন শক্তি: মেটার বিশাল চুক্তির পরেও কেন থামছে না নেবিয়াস?

অ্যামাজনের নতুন পরীক্ষা: অন্যান্য ওয়েবসাইটেও প্রাইম সদস্যদের ফ্রি শিপিং সুবিধা!

দ্রুত বর্ধিত ও দ্রুত সঙ্কুচিত মার্কিন শহরসমূহ

মাইক্রোসফটের ব্যবস্থাপক থেকে চাকরি হারিয়ে তিন বছরেও কর্মহীন! মনোবল হারাননি করিনা

মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি: যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনে বিপুল বৃদ্ধি

বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রইল না, তাই স্বামী আর ছেলেকে পাঠিয়ে দিলাম লন্ডনে! কেন জানেন?

চল্লিশ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান ক্যালওয়ে’র দেউলিয়ার ঘোষণা, বব ডিল্যানকে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকি!

বিশ্বযুদ্ধে বিমান প্রতিরক্ষা: অসম্ভব সবকিছু রক্ষা করা, পশ্চিমাদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়া

বিমানবন্দরে আইসিই কর্মীদের যাত্রী পরিচয় যাচাই শুরু

১০

বিখ্যাত গীতিকার চিপ টেলরের মৃত্যু: সঙ্গীত জগতের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি

১১

আফ্রিকার জন্য উদ্দেশ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নষ্ট হওয়ার উপক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে

১২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহানগরীগুলিতে অভিবাসন কমার প্রভাব: আদমশুমারি প্রতিবেদনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

১৩

নিউ ইয়র্ক সিটিতে অভিবাসন কমায় জনসংখ্যা স্থবির, দেশজুড়ে উদ্বেগ

১৪

ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় নেতাদের দ্বিধায় ফেলল ট্রাম্পের হুমকি

১৫

ঠান্ডা যুদ্ধের মহান অপরাধ: জাতির জনককে হত্যার দায় কোনও দেশের কাঁধে না থাকা কেন?

১৬

২০২৬-এর টিএসএ জটিলতা: বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশিতে যাত্রীদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

১৭

অনলাইন জুয়ার আয় থেকে শুরু, এখন জাতীয় স্তরের রেস্তোরাঁ চেইনের মালিক! এক উদ্যোক্তার বিস্ময়কর গল্প

১৮

পদ্মাপারে শোকের ছায়া: দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবিতে স্বজনদের বিলাপ

১৯

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সামরিক তৎপরতা নিক্সনের ভিয়েতনাম যুদ্ধকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে

২০