বিজ্ঞান আর প্রকৃতির রাজ্যে এমন সব বিস্ময় লুকিয়ে আছে, যা দেখলে চোখ কপালে উঠে যাবে! মানুষের হৃৎপিণ্ড প্রতি মুহূর্তে যে অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করে চলেছে, তা জানলে স্তম্ভিত হতে হয়। আমাদের শরীরের এই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রটি প্রতি দিন গড়ে এক লাখ বার স্পন্দিত হয় এবং প্রায় নয় হাজার পাঁচশো লিটার রক্ত পাম্প করে। শুধু তাই নয়, মানব হৃৎপিণ্ডের রয়েছে নিজস্ব বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে একে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা গেলে এটি স্বাধীনভাবেই বেশ কিছুক্ষণ ধুকধুক করতে পারে। এমন একটা যন্ত্রকে সচল রাখতে প্রকৃতি কতটা সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করেছে, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে!
প্রকৃতির অন্যতম দক্ষ শিকারি ফড়িং। এর শিকারের সাফল্যের হার প্রায় শতভাগ। বাঘ বা সিংহের মতো বড় শিকারিরা যেমন শিকারের পেছনে দৌড়ায়, ফড়িং কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। সে তার শিকারের উড়ার গতিপথ আগেই মস্তিষ্কে হিসেব করে নিয়ে সেখানে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফড়িংয়ের চারটি ডানা আলাদাভাবে নড়াচড়া করতে পারে, যা তাকে উড়ার দিক পরিবর্তনে অসাধারণ সাহায্য করে। এমন একটি ক্ষুদ্র প্রাণী কতটা সূক্ষ্ম গণিত আর বিজ্ঞানের খেলা দেখিয়ে দেয়, তা ভাবলে বিস্ময় দূর হয় না।
ডুমুর ফলের ভেতরে মৃত বোলতার উপস্থিতি দেখলে অনেকেই চমকে উঠবেন। প্রকৃতিতে মিথোজীবিতার এক দৃষ্টান্ত এটি। স্ত্রী বোলতা ডুমুরের ভেতরে ডিম পাড়তে ঢুকে আর বের হতে পারে না। ফলে ভেতরেই সে মারা যায়। পরে ডুমুর ফলটি নিজেই সেই মৃত বোলতাকে বিশেষ এক ধরনের এনজাইম দিয়ে গলিয়ে প্রোটিনে পরিণত করে। এমন স্বার্থক সহাবস্থান প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়। এ যেন জীবনের এক অদ্ভুত নাটক!
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এআই মডেলগুলো তৈরি করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, তা অবিশ্বাস্য। ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৪ মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় পঞ্চাশ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে পুরো সান ফ্রান্সিসকো শহর তিন দিন চলতে পারে। এছাড়া এআই মডেলগুলোর ডেটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে প্রচুর পানি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা পরিবেশবিদদের জন্য ক্রমশ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক উন্নতি যেমন মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি তার প্রভাবও হয়ে উঠছে বিপর্যয়ের কারণ।
বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় সবচেয়ে পুরোনো ডিএনএ আবিষ্কৃত হয়েছে গ্রিনল্যান্ডের চিরহরিৎ বরফের নিচ থেকে, যার বয়স প্রায় আড়াই লাখ বছর। এই ডিএনএ প্রাচীন উদ্ভিদ ও হাতির পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। তবে ডিএনএ সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বলে জুরাসিক পার্কের মতো ছয় কোটি বছর আগের ডাইনোসরের ডিএনএ থেকে তাদের পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতা যেমন বাস্তব, তেমনি এটি আমাদের প্রকৃতির শক্তির কাছে নিজেদের ক্ষুদ্রতা বুঝিয়ে দেয়।
মানুষের শরীরের সবচেয়ে ভারী অঙ্গ হলো ত্বক। এটি আমাদের শরীরের মোট ওজনের প্রায় ষোল শতাংশ দখল করে রাখে। ত্বক হলো শরীরের ইন্টেগুমেন্টারি সিস্টেমের অংশ, যা আমাদেরকে বহিরাগত জীবাণু থেকে রক্ষা করে। অভ্যন্তরীণ অঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে ভারী অঙ্গ হলো যকৃত বা লিভার। এই অঙ্গটি শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমন একটা অঙ্গের গুরুত্ব আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করে চলি।
একটি সাধারণ কাগজকে বারবার ভাঁজ করার ক্ষমতা নিয়ে গণিতের এক বিস্ময়কর সূত্র কাজ করে। একটি কাগজকে সর্বোচ্চ বার বার ভাঁজ করা যায় মাত্র বারো বার। কিন্তু যদি কোনোভাবে চৌতাল্লিশ বার ভাঁজ করা সম্ভব হতো, তবে এর উচ্চতা দাঁড়াত প্রায় সাড়ে চার লাখ কিলোমিটার—যা পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের চেয়েও বেশি! আর একশ তিন বার ভাঁজ করলে তা পুরো দৃশ্যমান মহাবিশ্বের চেয়েও বিশাল হয়ে উঠবে। এমন একটা সাধারণ জিনিসের মধ্যেও লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের রহস্য!
লোহাকে সোনায় পরিণত করার কথা শুনলে অনেকেই অবাক হন। বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রকৃতপক্ষে অন্য মৌল থেকে সোনা তৈরি করা সম্ভব হলেও তা পরিমাণে অত্যন্ত সামান্য। পারমাণবিক চুল্লিতে সিসা বা পারদকে প্রচুর নিউট্রন দিয়ে বোমাবর্ষণ করে সোনা তৈরি করা যায়। তবে এই প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ ব্যয় হয়, তা উৎপন্ন সোনার মূল্যের তুলনায় কয়েক কোটি গুণ বেশি। এছাড়া এই সোনা মারাত্মক তেজস্ক্রিয় হয়ে থাকে। বিজ্ঞান যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
মানুষের পেট থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ থেকে পনেরশ মিলিলিটার গ্যাস নির্গত হয়। এর মধ্যে মাত্র এক শতাংশের কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। সেই দুর্গন্ধের জন্য দায়ী হলো হাইড্রোজেন সালফাইড, যা পেটের ব্যাকটেরিয়া খাবার ভাঙার সময় উৎপন্ন করে। মানুষের শরীরের এই ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনগুলোই প্রকৃতির জটিলতাকে তুলে ধরে। এমন বিস্ময়কর তথ্যগুলো জানলে বিজ্ঞান যে কতটা রহস্যময় আর বিস্ময়কর, তা উপলব্ধি করা যায়।
মন্তব্য করুন