ProbasiNews
২২ মার্চ ২০২৬, ৪:৫৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মার্গারেট ব্রেনানের মুখোমুখি : ইরানে মার্কিন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ও বিশ্ব রাজনীতি

ওয়াশিংটন, মার্চ ২২, ২০২৬ — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। গতকাল রোববার সিবিএস নিউজের বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘ফেস দ্য নেশন’-এ উপস্থিত ছিলেন মার্কিন জাতিসংঘ দূত মাইক ওয়াল্টজ, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে, আইইএই-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি এবং মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট নেতা জেসন ক্রাউ। তাঁদের সাথে মুখোমুখি আলোচনায় উঠে এল ইরান সংঘাতের নানা অজানা দিক, বিশ্ব রাজনীতির জটিল হিসেব এবং মার্কিন প্রশাসনের সামনে দাঁড়ানো অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইসরায়েলের উপর ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও ফুটেজ প্রচার করা হয়। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় শহর দিমোনা ও আরাদে ইরানের প্রায় ২০০ জন আহত হন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়া সহ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুইটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইরান দাবি করলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত ইরানের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান ছিল। কিন্তু এই হামলার পর সেই হিসেব কি পাল্টে যাবে?

মার্কিন জাতিসংঘ দূত মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “ইরানকে তার সামরিক ক্ষমতা হারাতে হবে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে। তবে তাদের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান যে ইরানের শক্তির উপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে একত্রিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। তিনি বলেন, “ইরান বিশ্বের শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে জিম্মি করতে চাইছে। স্ট্রেইট অফ হরমুজে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যৌথভাবে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একত্রিত হচ্ছে।”

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে তাঁর বক্তব্যে ইরান সংঘাতের বৈশ্বিক প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপ সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও জানান যে ইউরোপীয় দেশগুলো সহ ২২টি দেশ মিলে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একত্রিত হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক অভিযানের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সময় লেগেছে।

তবে মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট নেতা জেসন ক্রাউ প্রশাসনের এই যুদ্ধকে ‘অননুমোদিত যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়নি। মার্কিন জনগণও এর পক্ষে নেই। যুদ্ধের ব্যয় দিনে দেড় বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব মারাত্মক।” তিনি আরও জানান যে প্রশাসন কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ অবহেলা করছে এবং জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইইএই-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বলেন, সামরিক অভিযান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করতে পারবে না। তিনি বলেন, “যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অনেক অবকাঠামো রয়ে যাবে। ইরান ইতিমধ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এই ক্ষমতা অর্জনের পর পুনরায় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।” তিনি আরও জানান যে ইরানের অনেক অবৈধ পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে যেগুলোর উপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

এছাড়া অনুষ্ঠানে চারজন মার্কিন নাগরিকের ইরানে জিম্মি হওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তাঁদের মধ্যে দুইজনকে ইরান সরকার ভুলভাবে আটক বলে মার্কিন সরকার ঘোষণা করেছে। ইরানে জিম্মি থাকা অবস্থায় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এমাদ শারগি বলেন, “অসহায় মার্কিন নাগরিকরা রাজনৈতিক পণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবশ্যই এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে হবে।”

এই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের মতামতও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। সিবিএস নিউজের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি মার্কিন প্রশাসনের ইচ্ছায় শুরু হয়েছে। এছাড়া ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেন এবং ৫৭ শতাংশ মনে করেন যুদ্ধটি ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খাতে এর প্রভাব মারাত্মক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হারভে কেন ওপেনএআইয়ের মতোই তুলছে বিপুল অর্থ? আইনশিল্পে বিপ্লবের লক্ষ্যে হারভের অভিযান

এআই বিপ্লবে নতুন শক্তি: মেটার বিশাল চুক্তির পরেও কেন থামছে না নেবিয়াস?

অ্যামাজনের নতুন পরীক্ষা: অন্যান্য ওয়েবসাইটেও প্রাইম সদস্যদের ফ্রি শিপিং সুবিধা!

দ্রুত বর্ধিত ও দ্রুত সঙ্কুচিত মার্কিন শহরসমূহ

মাইক্রোসফটের ব্যবস্থাপক থেকে চাকরি হারিয়ে তিন বছরেও কর্মহীন! মনোবল হারাননি করিনা

মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি: যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনে বিপুল বৃদ্ধি

বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রইল না, তাই স্বামী আর ছেলেকে পাঠিয়ে দিলাম লন্ডনে! কেন জানেন?

চল্লিশ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান ক্যালওয়ে’র দেউলিয়ার ঘোষণা, বব ডিল্যানকে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকি!

বিশ্বযুদ্ধে বিমান প্রতিরক্ষা: অসম্ভব সবকিছু রক্ষা করা, পশ্চিমাদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়া

বিমানবন্দরে আইসিই কর্মীদের যাত্রী পরিচয় যাচাই শুরু

১০

বিখ্যাত গীতিকার চিপ টেলরের মৃত্যু: সঙ্গীত জগতের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি

১১

আফ্রিকার জন্য উদ্দেশ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নষ্ট হওয়ার উপক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে

১২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহানগরীগুলিতে অভিবাসন কমার প্রভাব: আদমশুমারি প্রতিবেদনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

১৩

নিউ ইয়র্ক সিটিতে অভিবাসন কমায় জনসংখ্যা স্থবির, দেশজুড়ে উদ্বেগ

১৪

ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় নেতাদের দ্বিধায় ফেলল ট্রাম্পের হুমকি

১৫

ঠান্ডা যুদ্ধের মহান অপরাধ: জাতির জনককে হত্যার দায় কোনও দেশের কাঁধে না থাকা কেন?

১৬

২০২৬-এর টিএসএ জটিলতা: বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশিতে যাত্রীদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

১৭

অনলাইন জুয়ার আয় থেকে শুরু, এখন জাতীয় স্তরের রেস্তোরাঁ চেইনের মালিক! এক উদ্যোক্তার বিস্ময়কর গল্প

১৮

পদ্মাপারে শোকের ছায়া: দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবিতে স্বজনদের বিলাপ

১৯

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সামরিক তৎপরতা নিক্সনের ভিয়েতনাম যুদ্ধকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে

২০