দক্ষিণ কলকাতার একটি অভিজাত মিষ্টির দোকানের খদ্দেররা যখন গরম জিলাপির প্লেট সামনে পান, তখন তাঁদের চোখ ধাঁধিয়ে যায় অসাধারণ এক দৃশ্যে। চকচকে সোনার পাতলা পাত দিয়ে মোড়ানো সেই জিলাপির দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। রীতিমতো খাঁটি সোনার আবরণ দেওয়া হলেও এই মিষ্টিগুলো সম্পূর্ণ খাওয়ার উপযোগী থাকে। কিন্তু এই সোনাকে কীভাবে এত পাতলা করে ফেলা সম্ভব? সাধারণ ধাতুর মতো সোনাও যে খুব নরম ও নমনীয়, তা জানেন কি? বিজ্ঞানীরা বলছেন, সোনার এই বিশেষ ধর্মের জন্যই তাকে এভাবে ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞানের ভাষায় সোনাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নমনীয় ধাতু। সাধারণভাবে আমরা ধাতুর কাঠিন্য ও নমনীয়তার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারি না। কিন্তু রসায়নের ভাষায় এই দুই ধারণা আলাদা। লোহা বা তামা যতটা শক্ত এবং ভঙ্গুর, সোনা ততটা নয়। ইংল্যান্ডের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির রসায়নবিদ মাইক বুলিভ্যান্ট জানিয়েছেন, মাত্র ২৮ গ্রাম সোনা পেটালে তা থেকে তৈরি করা যায় প্রায় ১৬.৪ ফুট লম্বা ও চওড়া একটি পাত। তার চেয়েও অবাক করার বিষয় হলো, সোনার পাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা যায়—এর পুরুত্ব হতে পারে মানুষের চুলের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ কম! অর্থাৎ, এটি এতটাই পাতলা যে তাকে সহজেই খাবারের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু কেন সোনা এতটা নমনীয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার পরমাণুর গঠনে। সোনার পরমাণুগুলো একটি বিশেষ জ্যামিতিক কাঠামোয় সাজানো থাকে, যাকে বলা হয় ‘ফেস-সেন্টারড কিউবিক ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার’। এই গঠনের ফলে প্রতিটি পরমাণু তার আশেপাশের ১২টি পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে পুরো কাঠামোটি একসঙ্গে খুব সহজে বাঁকানো বা পাতলা করা যায়। এছাড়া, সোনার পরমাণুগুলো ধাতব বন্ধন দিয়ে যুক্ত থাকে, যার ফলে ইলেকট্রনগুলো মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। এই ইলেকট্রনের স্বাধীন চলাচলের কারণে সোনার পরমাণুগুলো একে অপরের ওপর দিয়ে সহজেই পিছলে যেতে পারে। ফলে তাকে পিটিয়ে অত্যন্ত পাতলা করা সম্ভব হয়।
তবে শুধু পরমাণুর গঠনই নয়, সোনার আরেকটি বিশেষ ধর্ম হলো এটি রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত নিষ্ক্রিয়। অধিকাংশ ধাতুর মতো সোনা সহজে মরিচা ধরে না, কারণ তার পরমাণুগুলো অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে সহজে বিক্রিয়া করতে চায় না। এর ফলে সোনার গ্রেইনগুলো ভেঙে যায় না, বরং একে অপরের সঙ্গে মিশে আরও পাতলা হতে থাকে। অন্যদিকে তামা বা রুপার ক্ষেত্রে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে তাদের উপর অক্সাইডের একটি স্তর তৈরি হয়, যা তাদেরকে পেটানোর সময় ভেঙে ফেলে। সোনার এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাকে এত পাতলা পাত তৈরি করা যায়।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, সোনার এই অবিশ্বাস্য নমনীয়তা ও রাসায়নিক স্থিতিশীলতার কারণে তাকে প্রায় যেকোনো খাবারের সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে মিষ্টান্নের সঙ্গে সোনা ব্যবহারের ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে সোনার পাত দিয়ে সাজানো খাবারগুলো গ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর রহস্য—যা সোনাকে অন্যান্য ধাতু থেকে আলাদা করেছে।
মন্তব্য করুন