মৌলভীবাজারের মনু নদের পাড় জুড়ে ফুটে উঠেছে প্রকৃতির এক অপরূপ দৃশ্য। শুক্রবার সকালে শহরের ফরেস্ট অফিস রোড ধরে হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ল সেই দৃশ্য—নদীর ধারের একটি ঝোপালো গাছ যেন সাজিয়ে নিয়েছে সাদা ও হালকা হলুদের রাজকীয় পোশাক। বরুণ ফুলের এমন অভাবনীয় বিস্তার দেখে মুগ্ধ হতে হয়। প্রতিটি শাখা থেকে যেন ঢেউ খেলিয়ে নামছে ফুলের সারি, আর ভোরের মৃদু আলোয় গাছটিকে ঘিরে যেন তৈরি হয়েছে এক স্বপ্নিল পরিবেশ। জীবনানন্দ দাশ যাকে বলেছিলেন ‘জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল’, সেই বরুণ গাছটি যেন মনু নদের স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
গাছটির ফুলগুলো যেন প্রদীপের আলোর মতো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে। পাতার ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে সাদা-হলুদ বর্ণের পাপড়ির দল। বসন্তের মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করতেই খসে পড়ছে ফুলের পাপড়ি, যেন প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে তুলছে এক অদ্ভুত সুন্দরের মহোৎসব। শহরের মাঝে এমন প্রাকৃতিক সম্পদ বিরল হলেও, মনু নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বরুণ গাছটি যেন প্রকৃতির এক অলিখিত উপহার। বছরের পর বছর ধরে এই গাছটি ফিরে আসে তার রাজকীয় সৌন্দর্য নিয়ে, যেন বারবার জানান দিতে চায় প্রকৃতির অফুরন্ত ঐশ্বর্যের কথা।
মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দপুর ফরেস্ট অফিস রোডের কাছে অবস্থিত এই গাছটি শুরুতে ছিল একটি ক্ষুদ্র চারার মতো। সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে তা এখন বিশাল আকৃতির বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। গাছটির দুটি প্রধান শাখা দুদিকে ছড়িয়ে রয়েছে, আর অসংখ্য উপশাখা থেকে আছড়ে পড়ছে ফুলের তরঙ্গ। গাছের নিচের মধুকূপী ঘাসের উপর টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে পাপড়ির দল। এমন দৃশ্য দেখলে মনে হয়, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শুধু মৌলভীবাজার শহরেই নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে কাউয়াদিঘি হাওর এলাকায়ও এখন দেখা মিলছে বরুণ গাছের। যদিও একসময় হাওরপারে বরুণ গাছের প্রাচুর্য ছিল অনেক বেশি, কিন্তু এখনো অনেকগুলো গাছ টিকে আছে। হাওরপারের বিভিন্ন গ্রামের বাড়ির আশেপাশে, খালের ধারে, এমনকি খালি জায়গায়ও দাঁড়িয়ে আছে এই গাছগুলো। তাদের উপস্থিতি যেন হাওর অঞ্চলের প্রকৃতিকে আরও মধুর, আরও মায়াবী করে তুলেছে।
বরুণগাছ সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা, এটি মূলত জলাভূমির গাছ হলেও শহরের ভেতরে এমন গাছ বিরল। এর আদি আবাস ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় স্পাইডার ট্রি, টেম্পল প্লান্ট বা গার্লিক পিয়ার। স্থানভেদে এর আরও অনেক নাম রয়েছে—বৈন্যা, শ্বেতপুষ্প, কুমারক, সাধুবৃক্ষ, শ্বেতদ্রুম। এই গাছটির উচ্চতা সাধারণত দশ থেকে বিশ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে হাওরপারের কোনো কোনো এলাকায় আরও বড় ও পুরনো বরুণ গাছের দেখা মিলে।
বরুণ গাছের ফুলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একাধিক ভেষজ গুণও। কাঁচা ফল সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়। ফুল ফোটার পরেই গাছে আসে ফল, যা দেখতে অনেকটা কতবেলের মতো। প্রাচীনকাল থেকেই এই গাছটিকে ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত করা হয়ে আসছে। গ্রীষ্মকালে যখন অন্যান্য বনফুলগুলো তার সৌন্দর্য প্রকাশ করে, তখন বরুণ ফুল যেন সবার সামনে সবচেয়ে বেশি মন কাড়ে। মাসখানেক ধরে সাদা ও হালকা হলুদ বর্ণের ফুলের রাজত্ব চলে এই গাছটির উপর। এমনকি বর্ষায় গাছটি যখন পানিতে ডুবে যায়, তখনও তার কোনো ক্ষতি হয় না—প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে নিজেকে টিকিয়ে রাখে।
মন্তব্য করুন