মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুয প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে মার্কিন নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপ দ্রুত সফল হবে না বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন, সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইন-এর মতো অস্ত্রের সহজলভ্যতা। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পুরো প্রণালীকে নিরাপদ করতে মার্কিন বাহিনীকে হয়তো সপ্তাহ বা মাস খানেক সময় লাগাতে পারে। এমনকি স্বল্পমাত্রার বিঘ্নতেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বুধবার বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ রবার্ট ম্যাকনেলি বলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি স্বত্ত্বেও হরমুয প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হওয়া সহজ হবে না। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাজারে একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে মার্কিন নৌবাহিনী যেকোনো পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীকে সুরক্ষিত করতে পারবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস বা পরিবহন পথের বিঘ্ন ঘটে, তখন তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে তার প্রভাব পড়বেই।’
বিশ্লেষকরা আরও জানান, ইরান যদি তার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মাইন-এর মতো অস্ত্র ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে মার্কিন বাহিনীকে প্রথমেই ইরানের সেই ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে। এ কাজটি সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লেগে যেতে পারে। এর ফলে তেলের দাম আগামী দিনগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ৭০ ডলার। কিছুদিন আগে তা ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বছর শুরুর তুলনায় তেলের দাম এখন ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ম্যাকনেলি সতর্ক করে বলেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ আরও তীব্র হয় এবং তারা বিশ্বের শক্তি ব্যবস্থার ‘মুকুটমণি’ হিসেবে পরিচিত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের উৎসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বুধবার ইসরায়েল ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানও কাতারের এলএনজি গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এমন ঘটনা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে।
তবে মার্কিন নৌবাহিনী এখন পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ দিয়ে তেল ট্যাংকারগুলিকে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, সামরিকভাবে সম্ভব হলেই তারা এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ম্যাকনেলি বলেন, ‘একটি প্রণালীকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে বেশ সময় লাগে। ইরানের রয়েছে বহু স্তরের অসম ক্ষমতা, যার মধ্যে রয়েছে উপকূলবর্তী প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন ও ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজ।’ তিনি আরও বলেন যে, যুদ্ধজাহাজ দিয়ে তেল ট্যাংকারগুলিকে পাহারা দেওয়ার আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে হবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুসারে, মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ইরানের উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত শক্তিশালী অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে ৫০০০ পাউন্ড ওজনের বাংকার বিধ্বংসী বোমা ফেলেছে। বৃহস্পতিবার তারা ইরানি নৌবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে জানায় যে এই হামলাগুলি হরমুয প্রণালীর কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টিকারী লক্ষ্যবস্তুগুলিকে ধ্বংস করেছে। এছাড়াও মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যেই ১২০টিরও বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং ইরানের ড্রোন ঘাঁটি, মাইন সংরক্ষণ কেন্দ্র ও টর্পেডো উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। মার্কিন এ-১০ অ্যাটাক বিমানগুলোও ইরানি দ্রুতগামী নৌযানগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ দিয়ে তেল ট্যাংকারগুলিকে পাহারা দেওয়ার মতো অভিযান চালাতে হলে পুরো অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের প্রায় সর্বস্ব ব্যয় করতে হবে। মার্কিন মিত্রদের সহযোগিতা ছাড়া এই অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে না বলে মত তাদের। বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, ‘এই অভিযানে অন্তত বারোটি ডেস্ট্রয়ারের প্রয়োজন হবে।’ তিনি আরও বলেন যে, যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও মার্কিন অভিযানে নিয়মিত যুদ্ধবিমানের টহলও চালাতে হবে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ম্যাকনেলি আরও উল্লেখ করেন যে, সস্তা ড্রোন ও ক্ষুদ্রাকৃতির আক্রমণাত্মক নৌযানের মতো সস্তা অস্ত্র ইরান ও অন্যান্য শক্তির কাছে সহজলভ্য হওয়ায় শক্তির উৎসগুলিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এখন যুদ্ধের একটি সাধারণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এমনকি সামান্য বিঘ্নও বিশ্ববাজারে তেলের দামকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের হুমকি দমনে মার্কিন প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।’
মন্তব্য করুন