ProbasiNews
২১ মার্চ ২০২৬, ৪:০৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নিউ ইয়র্কের আইসিইউ নার্স ন্যান্সি হ্যাগ্যান্সের জীবনের এক দিন: যে যাত্রায় মিশে আছে অঙ্গীকার আর মানবতার জয়গান

নিউ ইয়র্ক শহরের এক ব্যস্ত আইসিইউ-তে যখন সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি, এমন সময় ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল পাঁচটা ত্রিশ মিনিট দেখায়, তখনই উঠে পড়েন ন্যান্সি হ্যাগ্যান্স। তাঁর প্রতিদিনের শুরুটা হয় একটি প্রার্থনা দিয়ে—যেন তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন হয়ে ওঠে মানবসেবার মহান ব্রত। তারপর এক কাপ গরম কফির সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করেন দিনের অগ্নিপরীক্ষার জন্য। তাঁর কর্মক্ষেত্র নিউইয়র্কের বিখ্যাত মেইমোনাইডস মেডিক্যাল সেন্টারের আইসিইউ। গত চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন, যার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছেন সার্জিক্যাল আইসিইউ-তে।

আইসিইউ-র কাজ মানেই অনিশ্চিত এক জগৎ। এক মুহূর্ত আগেও হয়তো শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি। তাঁর হাসপাতালটি ট্রোমা সেন্টার হিসেবে পরিচিত, তাই কাজ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে প্রস্তুত থাকতে হয় যেকোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য। রাতের নার্সদের কাছ থেকে রোগীদের হালনাগাদ তথ্য নিয়ে শুরু হয় তাঁর দিনের কর্মযজ্ঞ। কিন্তু নিয়মিত দিন বলে কিছুই নেই এখানে। একেকটা দিন হয়ে ওঠে একেকটা নতুন চ্যালেঞ্জ।

কেন তিনি নার্সিং পেশায় এলেন, তার উত্তরে ন্যান্সি বলেন, তিনি হাইতির মানুষ। তাঁর দেশের অনেক অভিবাসী রোগীরাই হাসপাতালে বৈষম্যের শিকার হতেন। সেই অসহায়ত্ব থেকেই তিনি ঠিক করেন, এমন এক পেশায় যোগ দেবেন যেখানে তিনি নিজের সামর্থ্য দিয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষদের জন্য কিছু করতে পারবেন। তাঁর মতে, নার্সিং হলো এমন একটি পেশা যেখানে রোগী তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে আপনজন খুঁজে পান। একজন নার্সই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি রোগীর জীবনে প্রবেশ করেন প্রথম এবং বিদায় নেন শেষে। চাপের মুহূর্তে রোগীরা নির্ভর করেন তাঁদের নার্সের ওপর। তাই নিজের অনুভূতিকে সামলে নিয়েই তাঁকে মনোযোগ দিতে হয় রোগীর প্রতি।

তিনি বলেন, “আমাকে হয়তো একবার নিজেকে সামলে নিতে হবে, চোখ মুছে নিতে হবে, গভীর শ্বাস নিতে হবে। কিন্তু তারপরই আবার ফিরে যেতে হবে রোগীর কাছে। ভাবতে হবে, আমি কী করতে পারি যাতে এই মানুষটির জীবনে কিছুটা স্বস্তি আসে? তাঁর উদ্বেগ কীভাবে কমাতে পারি? আমি যদি নিজেই নার্ভাস হয়ে যাই, তাহলে রোগী এবং তাঁর পরিবার আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বেন। আমার কাজ হলো তাঁদের জন্য একজন অ্যাডভোকেট হয়ে ওঠা—নিশ্চিত করা যে তাঁরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে পারছেন। প্রতিটি রোগীই আমার কাছে একজন বিশেষ ব্যক্তি, তাই তাদের প্রতি আমি সর্বোচ্চ মাত্রার যত্ন নিই—ধর্ম, পটভূমি বা অভিবাসন স্থিতি যাই হোক না কেন।”

প্রযুক্তির উন্নতি তাঁর কর্মজীবনে এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। শুরুর দিকে যখন তিনি নার্সিং শুরু করেন, তখন সবকিছুই করতে হতো নিজের হাতে—ঔষধের মাত্রা হিসাব করা থেকে শুরু করে রোগীর রিপোর্ট হাতে লেখা পর্যন্ত। কিন্তু এখন কম্পিউটার তাঁর কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। তথ্য সংরক্ষণ থেকে শুরু করে হিসাবনিকাশ সবই হয়ে যায় দ্রুততার সঙ্গে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রযুক্তি মানবিক স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। এটি শুধুমাত্র তাঁদের কাজকে আরও কার্যকর করে তুলেছে, যাতে তাঁরা রোগীদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, “আমরা কখনোই চিকিৎসা ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কাটছাঁট করব না। আমরা আমাদের রোগীদের জন্য, সহকর্মীদের জন্য এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। কারণ বেশি সংখ্যক নার্স মানে আরও ভালো যত্ন। মানুষকে জানতে হবে যে নার্সরাই হলেন হাসপাতালের মূল স্তম্ভ। চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের ব্যতীত চলতে পারে না। আমরাই রোগীদের জীবন বাঁচিয়ে রাখি।”

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলির মধ্যে একটি ঘটেছিল প্রায় দেড় বছর আগে। একদিন সুপারমার্কেটে হাঁটার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এক প্রাক্তন রোগীর। সেই ব্যক্তি তাঁকে বলেছিলেন, “আপনি আমাকে মনে করতে পারেন না, কিন্তু আমি কখনই আপনাকে ভুলব না।” এমন কথাগুলিই তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মতে, নার্সিং হলো সবচেয়ে পুরস্কৃত পেশাগুলির মধ্যে একটি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হারভে কেন ওপেনএআইয়ের মতোই তুলছে বিপুল অর্থ? আইনশিল্পে বিপ্লবের লক্ষ্যে হারভের অভিযান

এআই বিপ্লবে নতুন শক্তি: মেটার বিশাল চুক্তির পরেও কেন থামছে না নেবিয়াস?

অ্যামাজনের নতুন পরীক্ষা: অন্যান্য ওয়েবসাইটেও প্রাইম সদস্যদের ফ্রি শিপিং সুবিধা!

দ্রুত বর্ধিত ও দ্রুত সঙ্কুচিত মার্কিন শহরসমূহ

মাইক্রোসফটের ব্যবস্থাপক থেকে চাকরি হারিয়ে তিন বছরেও কর্মহীন! মনোবল হারাননি করিনা

মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি: যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনে বিপুল বৃদ্ধি

বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রইল না, তাই স্বামী আর ছেলেকে পাঠিয়ে দিলাম লন্ডনে! কেন জানেন?

চল্লিশ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান ক্যালওয়ে’র দেউলিয়ার ঘোষণা, বব ডিল্যানকে চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকি!

বিশ্বযুদ্ধে বিমান প্রতিরক্ষা: অসম্ভব সবকিছু রক্ষা করা, পশ্চিমাদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়া

বিমানবন্দরে আইসিই কর্মীদের যাত্রী পরিচয় যাচাই শুরু

১০

বিখ্যাত গীতিকার চিপ টেলরের মৃত্যু: সঙ্গীত জগতের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি

১১

আফ্রিকার জন্য উদ্দেশ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নষ্ট হওয়ার উপক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে

১২

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহানগরীগুলিতে অভিবাসন কমার প্রভাব: আদমশুমারি প্রতিবেদনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

১৩

নিউ ইয়র্ক সিটিতে অভিবাসন কমায় জনসংখ্যা স্থবির, দেশজুড়ে উদ্বেগ

১৪

ইরান ইস্যুতে ইউরোপীয় নেতাদের দ্বিধায় ফেলল ট্রাম্পের হুমকি

১৫

ঠান্ডা যুদ্ধের মহান অপরাধ: জাতির জনককে হত্যার দায় কোনও দেশের কাঁধে না থাকা কেন?

১৬

২০২৬-এর টিএসএ জটিলতা: বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশিতে যাত্রীদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

১৭

অনলাইন জুয়ার আয় থেকে শুরু, এখন জাতীয় স্তরের রেস্তোরাঁ চেইনের মালিক! এক উদ্যোক্তার বিস্ময়কর গল্প

১৮

পদ্মাপারে শোকের ছায়া: দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবিতে স্বজনদের বিলাপ

১৯

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সামরিক তৎপরতা নিক্সনের ভিয়েতনাম যুদ্ধকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে

২০