কোরিয়ার রাজধানী সিউলে চাকরি করতেন বার্ট শ্যানেম্যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও মেয়ে। প্রায় দুই বছর আগে আমেরিকার কলোরাডো থেকে তাঁরা স্থায়ী হন সেখানে। কিন্তু গত মাসে চাকরি হারানোর পরও বার্টের মনে কোনো আফসোস নেই। কারণ, তাঁর স্ত্রী এখন পরিবারের কাছাকাছি থাকতে পারছেন, মেয়ে হয়ে উঠেছে দ্বিভাষিক, আর নিজেও গড়ে তুলেছেন নতুন এক সম্প্রদায়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বার্ট লিখেছেন, “এই অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।”
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্ট সিউলে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁর পুরো দলটিই ছাঁটাই করা হয়েছিল। সেদিন তিন শতাধিক সাংবাদিক একইসঙ্গে চাকরি হারিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেও বার্ট মনে করেন, তাঁদের পরিবারের জন্য সিউলে আসাটা ছিল এক সাহসী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। নিজের স্ত্রীর জন্যে তাঁর কাছে এই স্থান ছিল পুনর্মিলনের মাধ্যম। স্ত্রী প্রায় দশ বছর আমেরিকায় ছিলেন বিদেশি হিসেবে। তাঁর নিজের দেশে ফিরে এসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর জন্যে ছিল আনন্দের বিষয়।
বার্টের মেয়ের জন্যেও এই অভিবাসন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েটির মা ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার। ফলে তাঁর মাতৃভাষা ছিল কোরিয়ান। বার্ট চেয়েছিলেন মেয়েটি যেন দুই ভাষাতেই দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সেইসঙ্গে তাঁদের দেশে স্কুলে যে ধরনের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলো থেকে সুরক্ষিত থাকবে সেও একটা বিষয় ছিল। অন্যদিকে, কোরিয়ায় থাকাকালীন তাঁরা পেতেন বিনামূল্যে শিশুসেবা। এসব কারণেই বার্টের পরিবার স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আদৌ সহজ ছিল না। বার্টের পরিবার কলোরাডোয় একটি সুন্দর বাড়িতে থাকতেন। প্রচুর আসবাবপত্র ছিল। তাঁদের ছিল গাড়ি আর ভালো চাকরি। চল্লিশের কোটায় পৌঁছে তাঁদের জন্যে এই স্থানান্তর ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাঁরা শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠালেন সিউলে। বাকিটা বিক্রি করে দিলেন। এমনকি তাঁদের কুকুরটির জন্যও তাঁদের বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
কোরিয়ায় পৌঁছে তাঁরা ঠাঁই নিয়েছিলেন এক সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে। তাঁদের স্ত্রীর বাবা-মা থাকতেন কাছেই। ফলে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলো। মেয়েটি যখন স্কুল শেষ করতো, তখন তাঁর ঠাকুমা তাঁর জন্য তৈরি করতেন স্মুদি, আর তাঁকে দেখতেন কার্টুন। আর বার্ট তখন তাঁর অফিস শেষে ঘুরে আসতেন বাড়ির কাছে। মেয়েটি এখন দুই ভাষাতেই কথা বলতে পারে। এমনকি বার্ট যখন কোরিয়ান ভাষায় কথা বলেন, তখন তিনি চোখ রোল করে দেখান তাঁর বিরক্তি।
বার্ট এখন ভাবছেন, চাকরি হারানোর পরেও কেন তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা নিয়ে। তাঁরা নিজেরাও ভাবেন, কেন তাঁরা কিছু জিনিস ছেড়ে দিয়েছিলেন। কেন তাঁরা সেই সাজানো ক্রিসমাস প্লেটটা সঙ্গে নিয়ে এলেন না? কেন তাঁর সাইকেলটা পাঠালেন না? কারণ তাঁর উচ্চতার জন্য উপযুক্ত সাইকেল কোরিয়ায় পাওয়া মুশকিল।
বার্টের স্ত্রী এখন সেখানে সুখী। তাঁর মেয়ে হয়ে উঠেছে দ্বিভাষিক। আর বার্টও তৈরি করেছেন নতুন এক সম্প্রদায়। তাঁর বেশ কয়েকজন বিদেশি বন্ধুকে তিনি সাহায্য করেন। তাঁরা সবাই মিলে একে অন্যের যত্ন নেন। বার্টের চাকরি হারানোয় তিনি দুঃখিত হলেও, তিনি এটিকে নতুন করে নিজেকে মূল্যায়ন করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি তাঁর পরিবারকে নিয়ে আরও সময় কাটাতে পারছেন। তাঁর মেয়ে যখন স্কুলে যায়, তখন তিনি তাঁকে পৌঁছে দিতে পারেন। তাঁর জীবনে আরও একবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ এসেছে। বার্ট বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ এই সময়ের জন্য।”
মন্তব্য করুন