আজকের ব্যস্ত বিশ্বে প্রতিটি অভিভাবকই চান তাঁর সন্তান যেন সুখী, আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে উঠুক। কিন্তু কীভাবে সেই আদর্শ প্যারেন্টিং সম্ভব? সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দ্য ড্যানিশ ওয়ে অফ প্যারেন্টিং: হোয়াট দ্য হ্যাপিয়েস্ট পিপল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড নো অ্যাবাউট রেইজিং কনফিডেন্ট, ক্যাপেবল কিডস’ গ্রন্থের লেখিকা জেসিকা জোয়েল আলেকজান্ডার ডেনমার্কের প্যারেন্টিং-এর এমন কিছু অনন্য পদ্ধতির কথা তুলে ধরেছেন, যা আমেরিকানদের মতো দেশেও অনুসরণ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, ডেনমার্কের মানুষেরা বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শিশুদের লালন-পালন করেন। তাই অন্যান্য দেশের অভিভাবকদের উচিত তাদের কাছ থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা।
ডেনমার্কের প্যারেন্টিং-এর মূলমন্ত্র হলো ‘হাইগি’ (Hygge) অর্থাৎ স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের সাথে জীবনযাপন করা। এই ধারণাটি শিশুদের মনেও প্রবেশ করানো হয়। অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের সাথে সমান অধিকারে কথা বলেন, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেন এবং শাস্তির পরিবর্তে ইতিবাচক শিক্ষা দেন। এমনকি খেলাধুলাকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রাখা হয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার উপর জোর দেওয়া হয়। লেখিকা জেসিকা আলেকজান্ডার তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ডেনমার্কের শিশুরা কেন এতটা আত্মবিশ্বাসী ও সুখী থাকে তা নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এই পদ্ধতিগুলো আমেরিকার মতো দেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব হলে সেখানকার শিশুরাও আরও সুখী ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
ডেনমার্কের প্যারেন্টিং-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমানাধিকার। সেখানে পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে কোনো ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা থাকে না। শিশুরা নিজেদের মত প্রকাশ করতে স্বাধীন এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমনকি স্কুলেও শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই পদ্ধতি শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং তাদের সামাজিক দক্ষতা উন্নত করে। লেখিকা জেসিকা আলেকজান্ডার তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ডেনমার্কের অভিভাবকেরা কখনই তাদের সন্তানদেরকে ‘না’ বলেন না। বরং তারা তাদের সন্তানদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে শিশুরা নিজেদেরকে মূল্যবান মনে করে এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণ বিকাশ লাভ করে।
আমেরিকান প্যারেন্টিং-এর তুলনায় ডেনমার্কের পদ্ধতি অনেক বেশি সহজ ও প্রাকৃতিক। সেখানে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদেরকে কোনো কঠোর নিয়মের মধ্যে রাখেন না। বরং তারা তাদের স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেন। এমনকি খাবার নিয়েও তাদের মধ্যে কোনো বিধিনিষেধ থাকে না। শিশুরা নিজেদের পছন্দমতো খাবার খেতে পারে, যার ফলে তাদের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসের কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। লেখিকা জেসিকা আলেকজান্ডার মনে করেন, আমেরিকার অভিভাবকেরা যদি ডেনমার্কের এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেন, তাহলে তাদের সন্তানদের মধ্যেও সুখ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কও আরও মজবুত হবে।
তবে ডেনমার্কের প্যারেন্টিং-এর এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে হলে অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। অনেকেই মনে করেন, শিশুদেরকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেওয়া হলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ডেনমার্কের শিশুরা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল। তারা নিজেদের কাজ নিজেরাই করতে পারে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকে। লেখিকা জেসিকা আলেকজান্ডার তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, আমেরিকার অভিভাবকেরা যদি ডেনমার্কের এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সন্তানরা আরও সুখী ও দক্ষ হয়ে উঠবে। এমনকি তারা নিজেদের জীবনে আরও সফল হতে পারবে।
মন্তব্য করুন