মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধগুলির মধ্যে অন্যতম চলমান সংঘাতের মধ্যেই আবারও সংকটে পড়েছে লেবানন। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান ও স্থল আক্রমণ পরিচালনার মূল লক্ষ্য হিজবুল্লাহ নামক ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ। গাজায় হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েল নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির জন্য এটি এক নতুন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৯০ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে দেশটি একটি সূক্ষ্ম ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় হিজবুল্লাহকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তারা ইরানের সমর্থনে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নামে এই দলটি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এমনকি লেবাননের সামরিক বাহিনী (এলএএফ) এর তুলনায় তাদের সামরিক শক্তি অনেক বেশি।
২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পর জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। বরং দলটি তাদের সামরিক শক্তি আরও বৃদ্ধি করেছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করলেও লেবাননের সরকার এই দলটির বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কারণ এলএএফকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলে তা দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে।
লেবাননের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ক্যারিম এমিল বিতারের মতে, এলএএফকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলে তা দেশটির স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, “এলএএফ লেবাননের শেষ অবশিষ্ট আন্তঃধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। এটি দেশের জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে বিশ্বস্তও। যদি এই বাহিনীকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তবে তা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ হিজবুল্লাহ শুধু একটি মিলিশিয়া নয়, এটি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বিশাল রাজনৈতিক শক্তিও। অনেক সৈনিকই শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননের সরকারও একটি কঠিন অবস্থানে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম প্রকাশ্যে হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বললেও বাস্তবে তা কঠিন। কারণ দেশটির অর্থনৈতিক সংকট ইতিমধ্যেই তীব্র। যুদ্ধের কারণে আরও এক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হিজবুল্লাহর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই এখন অসন্তুষ্ট। তাদের অনেকেই সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছে। এমনকি কিছু এলাকায় শিয়া শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার জন্য এটি একটি উপযুক্ত সময়। কারণ ইরানের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে এবং অঞ্চলটি রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, হিজবুল্লাহর প্রায় ৯০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে দলটির নেতৃত্বাধীন রাদওয়ান ইউনিটের বিশেষ বাহিনী এখনও সক্রিয় রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবানন থেকে নির্মূল করা, তবে দীর্ঘমেয়াদে পুরো লেবানন থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি দূর করতে চান তারা।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, “হিজবুল্লাহ একটি বড় সমস্যা। এটি দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দ্রুত নির্মূল করা দরকার।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েল যদি হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়, তবে তা লেবাননের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর ফলে লেবাননে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ হিজবুল্লাহর সমর্থকরা কখনই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনে আরও দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে।
মন্তব্য করুন