রাশিয়ায় এক হত্যার দায়ে জেল খাটা আলেক্সান্দর আব্বাসভ-দেরস্কান তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলেন। জেল থেকে মুক্তির পরে তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ইউক্রেনকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুদ্ধে অংশ নিলে তিনি নিজের পাশাপাশি পরিবারের জন্যও একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে তাঁর কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কখনোই মেলেনি। বরং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে তিনি দেখেছেন, তাঁর প্রতি দেশের অবহেলা আর প্রতারণা।
আলেক্সান্দরের গল্প শুধু তাঁর একার নয়, রাশিয়ার এমন হাজারো সেনার গল্প, যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন নিজেদের জীবনকে পুনর্গঠনের জন্য। কিন্তু যুদ্ধ থেকে ফিরে তাঁরা দেখেছেন, সরকারের কাছ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু কাগজেই রয়ে গেছে। তাঁর মতো অনেকেই যুদ্ধের সময় পা হারিয়েছেন, শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কিন্তু যুদ্ধোত্তর সাহায্য বা পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। আলেক্সান্দরের মতো সেনারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, দেশের প্রতি তাঁদের এই ত্যাগ কি আদৌ কোনো মূল্য পেয়েছে?
মস্কোর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বালাশিখা শহরে আলেক্সান্দরের জীবন এখন এক অনিশ্চিত যাত্রা। যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন কয়েদি, কিন্তু যুদ্ধ তাঁকে দিয়েছিল একটা নতুন পরিচয় ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। তাঁর বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায়, কিন্তু যুদ্ধ তাঁকে একটা নতুন জীবনের আশা দিয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম আমার পরিবারের জন্য একটা ভালো জীবন গড়ে তুলতে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, আমার একটা পা হারিয়ে ফেলেছি, আর সরকার আমাকে যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা আর কখনোই পাইনি।”
রাশিয়ার সরকার যুদ্ধবন্দীদের জন্য বিশেষ সাহায্য কর্মসূচি চালু করেছিল বলে দাবি করলেও, প্রকৃতপক্ষে তা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আলেক্সান্দরের মতো অনেক সেনা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারি সাহায্য পেতে তাঁদের বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাঁদের অনেকেই এখন অভাব অনটনের মধ্যে জীবন যাপন করছেন, আর সরকার তাঁদের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
আলেক্সান্দরের মতো সেনাদের প্রতি এই অবহেলা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকভাবেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। রাশিয়ার সমাজে যুদ্ধফেরত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকলেও, সরকারের অবহেলা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে। অনেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছেন, কেউবা নিজেদের জীবনে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আলেক্সান্দর বলেন, “আমি আমার দেশের জন্য লড়েছি, কিন্তু দেশ আমাকে যে প্রতারণা করেছে, তা আমি কোনোদিন ভুলব না।” তাঁর মতো হাজারো সেনা এখন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ কতটা শোনা যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মন্তব্য করুন