ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের জগতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। মার্ক জাকারবার্গের মেটা কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলি এআই নির্ভর বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম চালু করায় এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়াতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মাদিসন অ্যান্ড ওয়াল নামে একটি পরামর্শদাতা সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এআই চালিত বিজ্ঞাপনের বাজার দাঁড়াবে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা মোট বিজ্ঞাপন ব্যয়ের ১২ শতাংশ। অপরদিকে, যেসব বিজ্ঞাপন এআই নির্ভর নয়, সেগুলির প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ৫ শতাংশ।
এআই চালিত বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মূলত স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, বিডিং, বাজেট বণ্টন এবং প্রচারণা অপ্টিমাইজেশনের মতো কাজগুলি করা হয়। মেটার ‘অ্যাডভান্টেজ+’ এবং গুগলের ‘পারফরম্যান্স ম্যাক্স’ হলো এই ধরনের প্রধান দুটি টুল। এছাড়াও আমাজন, টিকটকসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও এ ধরনের এআই নির্ভর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। মাদিসন অ্যান্ড ওয়ালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুক স্টিলম্যান মনে করেন, এআই চালিত বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন খাতের প্রবৃদ্ধির একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এআই চালিত বিজ্ঞাপন বলতে সেইসব ব্যয়কে বোঝায় যেখানে এআই সিস্টেমগুলি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজ্ঞাপনের প্রচারণা পরিচালনা করে থাকে।
এআই নির্ভর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা বিজ্ঞাপন তৈরী ও প্রচারের সময় অনেকাংশে কমিয়ে দেয় বলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলি দাবি করলেও কিছু বিজ্ঞাপনদাতা এসব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চান না। বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই যখন বিড়ম্বনামূলক বিজ্ঞাপন তৈরী করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তখন অনেকেই এই ধরনের ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে থাকেন। স্টিলম্যান জানান, ক্ষুদ্র বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও সাম্প্রতিককালে বড় বড় ব্র্যান্ডগুলিও এই ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। যদিও বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনদাতাই নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তবে যখনই এআই চালিত ব্যবস্থা তাদের বিজ্ঞাপনের রিটার্ন অন অ্যাড স্পেন্ড (আরওএএস) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হয়, তখন স্বচ্ছতার বিষয়টি গৌণ হয়ে যায়।
মাদিসন অ্যান্ড ওয়ালের হিসেব অনুযায়ী, এআই চালিত বিজ্ঞাপনের বাজেট আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার হবে প্রায় ২৯ শতাংশ। এর ফলে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় ও দক্ষ হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা বিজ্ঞাপনের মান ও সৃজনশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, মানব নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার অভাব বিজ্ঞাপনের গুণগত মান নষ্ট করতে পারে।
বিজ্ঞাপন খাতের এই পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের বিপণন কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। এআই নির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বিজ্ঞাপনের ব্যয় কমছে, দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রচারণার ফলাফল আরও ভালো হচ্ছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে সতর্কতাও রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এআই চালিত বিজ্ঞাপনের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেলে বিজ্ঞাপনের জগতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন