একটা সময় ছিল যখন স্কুলের গেটে সবচেয়ে পুরোনো গাড়িটা ছিল নিজের। সেটা নিয়ে বিব্রতবোধ করতাম। বছরের পর বছর পুরোনো সব গাড়ি কিনতাম, কিন্তু শেষমেশ একটা নতুন গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিতেই হল। প্রায় ১৬ লাখ টাকা খরচ করে কিনলাম একটা হোন্ডা ওডিসি— আর এখন আফসোসে দিন কাটছে। কারণটা একটাই: গাড়িটা আমার সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।
গাড়িটা কেনার পর প্রথম কয়েক মাস খুব ভালো লাগছিল। পরিবারের সবাই মিলে আনন্দে ভুগছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আনন্দ উবে যাচ্ছে। মাসিক কিস্তির চাপ, বাড়তি রেজিস্ট্রেশন ফি আর বীমার খরচ— সব মিলিয়ে টাকার চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। পুরোনো গাড়ির মতো স্বাধীনতা আর নেই। এখন বুঝতে পারছি, স্বাচ্ছন্দ্য চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তার দামটা অনেক বেশি হয়ে গেছে।
ছোটবেলায় মায়ের পুরোনো মাজদা গাড়িতে চড়ে স্কুল যেতাম। এসিতে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছত না। তাই ঘামে ভিজে যেতাম। বাবা-মা পুরোনো গাড়ি চালাতেন। তাঁদের কাছে গাড়ির মালিকানা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাছ থেকে সেই শিক্ষাই পেয়েছিলাম আমিও। বছর বিশেক ধরে শুধু সেই নীতিই মানছিলাম— যতটুকু টাকা আছে, ততটুকু গাড়ি কিনতাম। কিন্তু গত বছর নিজের গাড়ির এসি নষ্ট হয়ে গেল। তারপর থেকে একের পর এক মেরামতের খরচ। তিন সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য কিছু চাইছিলাম। ব্যাকআপ ক্যামেরা যুক্ত একটা গাড়ি দরকার ছিল।
পুরোনো গাড়ির উপর আস্থা রাখতাম। সাধারণত ১ লাখ মাইলের কাছাকাছি গাড়ি কিনতাম। কারণ তখন দাম কম হত, আর বড় ধরনের মেরামতের ঝুঁকিও কম থাকত। কিন্তু এবার এক বান্ধবীর কাছ থেকে নতুন ধারণা পেলাম। সেও আগে পুরোনো গাড়ি চালাতো। কিন্তু মাসিক কিস্তির কথা ভেবে প্রায় নতুন একটা সুবারু অ্যাসেন্ট কিনল। সে হিসেব কষে বলল, পুরোনো গাড়ির মেরামতের খরচ আর অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই এই সিদ্ধান্ত। তার গাড়িতে বসে আমারও মনে হলো, কেন আমি পারব না? আমি তো পরিশ্রম করি, আমার পরিবারও তো একটা নির্ভরযোগ্য গাড়ির দাবিদার।
স্কুলের গেটে সবচেয়ে পুরোনো গাড়িটা ছিল নিজের— এটা নিয়ে বিব্রত হতাম। অন্যদের নতুন গাড়ির সামনে নিজের পুরোনোটা দেখতে খারাপ লাগত। তাই পুরোনো গাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। নতুন গাড়ির খোঁজ শুরু করলাম। কিন্তু আট আসনের গাড়ির জন্য তখনকার বাজারে কমপক্ষে ২৪ লাখ টাকা লাগত। আমার কাছে ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা। তাই গাড়ির কিস্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্রোকারকে বললাম ২৪ লাখ টাকার মধ্যে যেন গাড়ি খুঁজে দেয়। সে একটা ২০১৭ সালের হোন্ডা ওডিসি দেখালো দাম ২৭ লাখ টাকা, মাইলেজ ছিল ৭৩ হাজার। প্রথমে দামটা বেশি মনে হলেও পরে বুঝলাম আসলে ওটাই ভালো ডিল ছিল। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে।
শেষমেশ ২০২২ সালের একটা হোন্ডা ওডিসি কিনলাম। মাইলেজ ছিল ৫৩ হাজার, দাম ধরা হলো ৩৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭ টাকা। নিজের কাছে ছিল ১১ লাখ টাকা। বাকিটা ৫.৩৯% সুদে চার বছরের কিস্তিতে পরিশোধ করা শুরু করলাম। মাসিক কিস্তি দাঁড়ালো ৫৩০ টাকা ৮০ পয়সা। নয় মাসে মোট ৪ হাজার ৭৭৭ টাকা পরিশোধ করেছি। ফলে এখন পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টাকা। আর বাকি আছে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
শুরুতে গাড়িটা নিয়ে পরিবার খুব খুশি ছিল। মসৃণ রাইড, ব্লুটুথ, চামড়ার আসন, ব্যাকআপ ক্যামেরা— সবই ছিল। স্কুলের গেটে গিয়ে একটু গর্বও হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আনন্দ কমে গেছে। এখন মাসিক কিস্তির কথা ভাবলেই চিন্তা হয়। নতুন গাড়ির জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি আর ৪০০ টাকা বেশি করে বীমাও দিতে হচ্ছে। পুরো কিস্তির সময়কালে প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা সুদ হিসেবে দিতে হবে। যদিও এটা বেশি না, কিন্তু প্রতিমাসে টাকা চলে যাচ্ছে— এটা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যায়।
পুরোনো গাড়ির মতো স্বাধীনতা ছিল না। পুরোনো গাড়িতে মেরামতের খরচ হতো ঠিকই, কিন্তু মাস শেষে কাউকে টাকা দিতে হতো না। টাকার টান কম থাকলে মেরামতের কাজটা পিছিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন ঋণের টাকা নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আরাম আর আরামদায়ক রাইড খুব ভালো লাগে, কিন্তু আর্থিক স্বাধীনতা তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। নতুন গাড়ি জীবনে আরাম এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও হারিয়ে ফেলেছি। যে স্বাধীনতা হারিয়েছি, তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না— এটা এখন টের পাচ্ছি।
মন্তব্য করুন