চীনের অভিবাসী দম্পতির পরম যত্নে বেড়ে উঠছিলেন অলিভিয়া জ্যাং। কিন্তু তার জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে যখন তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে হারান তাঁর দাদা এবং প্রিয় শিক্ষককে— ক্যান্সারের কাছে। সেই দুঃখ তাকে তাড়া করে ফিরছিল। তারই মধ্যে তিনি ভাবতে শুরু করলেন, এমন কিছু করা দরকার যা সমাজকে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতে পারবে। আর ঠিক তখনই তাঁর মাথায় এল এক নতুন চিন্তা— ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের জন্য কিছু করা। সেই ভাবনা থেকেই, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ক্যান্সার কিডস ফার্স্ট’ নামে একটি অলাভজনক সংগঠন।
প্রাথমিকভাবে তাঁর অভিবাসী অভিভাবকেরা তাঁর এই উদ্যোগকে পুরোপুরি সমর্থন করেননি। তাঁরা চাইতেন অলিভিয়া যেন কেবল পড়াশোনা আর অতিরিক্ত ক্লাসেই মনোযোগ দেন। কিন্তু অলিভিয়ার মন ছিল অন্য দিকে। তিনি জানতেন, তাঁর দাদা এবং শিক্ষকের মতো আরও অনেক মানুষ ক্যান্সারের সাথে লড়াই করছেন। তাঁর নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করে তিনি কিছু অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন তাঁদের চিকিৎসার জন্য। যখন তাঁরা চলে গেলেন, সেই অর্থ তিনি দান করলেন সেন্ট জুড হাসপাতালে। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, শুধু অর্থ দান নয়, তাঁর আরও কিছু করা উচিত। তাই তিনি নিজেই হাতে তুলে নিলেন সেই দায়িত্ব— হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মানসিক শক্তি জোগাতে, তাদের আনন্দ দিতে।
প্রথম দিকে তাঁর সংগঠনের কাজ ছিল খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে। তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে শিশুদের সাথে কথা বলতেন, তাদের জন্য ছবি আঁকতেন, কিছু মজার আয়োজন করতেন। কিন্তু যখন তিনি টিকটকে তাঁর সংগঠনের কাজ তুলে ধরলেন, তখনই ঘটে গেল এক বিরাট পরিবর্তন। তাঁর ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে গেল। এক রাতে চলে এল চার হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবীর আবেদন! এখন এই সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছে বিশ্বের আশিটি দেশের চল্লিশ হাজারেরও বেশি যুবক-যুবতী। অলিভিয়ার এই অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে নিয়ে গেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি এখন তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। তাঁর অভিভাবকেরা বারবার তাঁকে প্রশ্ন করতেন তাঁর এই কাজ নিয়ে। তাঁর মা প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন পরীক্ষায় যদি তিনি ‘এ’ গ্রেডের পরিবর্তে ‘এ মাইনাস’ পান তাহলে কী হবে! অথচ আজ তাঁর মা নিজেই গর্বের সাথে বলেন যে তাঁর মেয়ে হার্ভার্ডে পড়ছে— যা তাঁদের পরিবারের জন্য এক বিশাল স্বপ্নের সফলতা। অলিভিয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মা তাঁকে সব সময় বলতেন যে তিনি যেন নিজেকে সবার থেকে পিছিয়ে রাখেন, নীরবে কাজ করেন। কিন্তু অলিভিয়ার স্বভাব ছিল আলাদা— তিনি সব সময় কথা বলতে চাইতেন, নেতৃত্ব দিতে চাইতেন। আর সেই নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছাই তাঁকে নিয়ে গেছে আজকের এই উচ্চতায়।
বর্তমানে অলিভিয়া তাঁর সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে তাঁর প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে পরিবর্তন আনার এক বিশাল ক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের কেবল সুযোগ দেওয়া দরকার। তাঁর সংগঠনের মাধ্যমে তিনি শুধু ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের সাহায্যই করছেন না, তিনি গড়ে তুলছেন এক দল উদ্যমী নেতৃত্ব, যারা একদিন পুরো বিশ্বকে পাল্টে দিতে পারে।
মন্তব্য করুন