হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা নির্ভর করে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর— নতুন গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক ড. ড্যানশিয়া ইউ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের সম্পর্ক নিয়ে। তাঁর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা উৎপন্ন ক্ষুদ্র অণুজীবগুলি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাঁর দল প্রায় ১০,০০০ মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ভারসাম্যহীন, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিও বেশি। যদিও গবেষণাটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ না হলেও, এটির ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ড. ড্যানশিয়া ইউ তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে তিনটি সহজ উপায় তুলে ধরেছেন, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করবে। প্রথমত, তিনি বলেছেন খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদজাত খাবারের প্রাধান্য দিতে। বিশেষ করে ফল, শাকসবজি, বাদাম ও ডাল জাতীয় খাবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক। তাঁর মতে, পরিশোধিত শস্য জাতীয় খাবারের বদলে পূর্ণ শস্যের খাবার খেতে হবে, কারণ এতে রয়েছে অধিক পরিমাণে ফাইবার, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, সম্ভব হলে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার অন্তর্ভুক্ত করলে উপকার পাওয়া যায় বেশি।
দ্বিতীয়ত, তিনি পরামর্শ দিয়েছেন নিজে থেকে খাবার তৈরি করার অভ্যাস গড়ে তুলতে। অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার এটি অন্যতম কার্যকরী উপায়। প্রক্রিয়াজাত খাবারে উপস্থিত ক্ষতিকারক উপাদান অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। ড. ইউ নিজেও নিয়মিত পরিবারের সাথে মিলে খাবার তৈরি করেন। তাঁর কথায়, “আমি চাইনিজ হিসেবে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি এবং প্রোটিন যেমন চিংড়ি, মুরগি বা টফু দিয়ে ভাজি তৈরি করি। এমনকি যদি কিছু প্রক্রিয়াজাত উপাদান ব্যবহার করতেও হয়, তাহলেও পুরো খাবারটি প্রক্রিয়াজাত খাবারের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর হবে।”
তৃতীয়ত, তিনি ব্যায়ামের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার গঠন ভিন্ন থাকে। ব্যায়াম অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যদিও কোন ধরনের ব্যায়াম সর্বোত্তম, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট গবেষণা না হলেও ড. ইউ বলেছেন, “যে কোন ব্যায়ামই না করার চেয়ে ভালো।” ব্যায়ামের ফলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।”
বর্তমান সময়ে দ্রুত জীবনযাপনের কারণে অনেকেই প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। কিন্তু অন্ত্রের স্বাস্থ্য উপেক্ষা করলে তা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের মতো মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। তাই ড. ইউ-এর পরামর্শ অনুযায়ী, খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদজাত খাবারের প্রাধান্য দেওয়া, নিজে থেকে খাবার তৈরি করার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। এই তিনটি সহজ পদক্ষেপ অনুসরণ করলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
বর্তমান সমাজে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে আগ্রহ বাড়ছে। ড. ড্যানশিয়া ইউ-এর এই গবেষণা সেই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। সুস্থ অন্ত্র, সুস্থ হৃদয়— এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের উচিত নিজেদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। তবেই সুস্থ জীবনের স্বপ্ন সফল হবে।
মন্তব্য করুন