OpenAI-এর মতো প্রতিষ্ঠান যখন একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্য তৈরি করে এবং সেই পণ্যের খরচ মেটানোর উপায় খুঁজতে থাকে, তখন সেই ভার সামলানো একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্রান্তিলগ্নে প্রতিষ্ঠানটির সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ—মুনাফা অর্জন, গবেষণা ও বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া। এই অসাধ্য সাধনের দায়িত্ব এখন বহন করছেন ফিজি সিমো নামে এক নির্বাহী। মাত্র ৪০ বছর বয়সী সিমো পূর্বে ইনস্টাকার্টের প্রধান নির্বাহী ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে মেটা (পূর্বে ফেসবুক)-তে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান তাকে প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ্লিকেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। তার মূল দায়িত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির পণ্যগুলোকে লাভজনক করা এবং তা বাজারজাতকরণের উপযোগী করে তোলা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ওপেনএআই-এর আগামী পাঁচ বছরের ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ ক্ষতির রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। এই বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
ফিজি সিমো তার দলকে নিয়ে এমন এক সময়ে কাজ শুরু করেন যখন প্রতিষ্ঠানটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ গঠনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন, যার মধ্যে রয়েছে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং কর্মীদের মধ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা। তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকে মিলিত হন এবং তাদের মতামত শোনেন। তার নেতৃত্বে ওপেনএআই এখন বিজ্ঞাপন, এন্টারপ্রাইজ ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষায়িত পণ্য এবং কোডিং টুলের ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তন সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিছু গবেষক অভিযোগ করেছেন যে প্রতিষ্ঠানটি এখন গবেষণার চেয়ে পণ্য উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যার ফলে মৌলিক গবেষণার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরি টুওরেক গত জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন এই বলে যে তিনি এমন ধরনের গবেষণা করতে চান যা ওপেনএআই-এ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদ টম কানিংহামও গত ডিসেম্বরে পদত্যাগ করেন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে।
ফিজি সিমোর নেতৃত্বে ওপেনএআই এখন এমন এক পথে হাঁটছে যেখানে গবেষণা ও বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বারবার বলেছেন যে প্রতিষ্ঠানটি এখনও তার গবেষণাধর্মী ভিত্তি হারাতে চায় না। তিনি মনে করেন, গবেষণা ছাড়া কোনো পণ্যই টেকসই হতে পারে না। তার নেতৃত্বে ওপেনএআই এখন এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলতে চাইছে যেখানে গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন একই সঙ্গে চলতে পারে।
ফিজি সিমোর জীবনের গল্পটিও কম আকর্ষণীয় নয়। ফ্রান্সের একটি ছোট মৎস্য শহর থেকে উঠে আসা সিমো ছিলেন তার পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফ্রান্সের একটি অভিজাত ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রযুক্তি জগতে প্রবেশ করেন। তার কর্মজীবন শুরু হয় ইবে-তে ইন্টার্নশিপ দিয়ে এবং পরে তিনি ফেসবুকে যোগ দেন। সেখানে তিনি কোম্পানির প্রধান অ্যাপটির মনিটাইজেশন এবং নতুন পণ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইনস্টাকার্টের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি কোম্পানিটিকে মহামারীর সময়েও সফলভাবে পরিচালনা করেন এবং ২০২৩ সালে কঠিন বাজার পরিস্থিতিতেও কোম্পানিটিকে পাবলিক করতে সক্ষম হন।
ফিজি সিমোর নেতৃত্বে ওপেনএআই এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন শুধু গবেষণার জন্য নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ভোক্তা পণ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। তার নেতৃত্বে ওপেনএআই-এর সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে প্রতিষ্ঠানটি তার মৌলিক মূল্যবোধ হারাবে না। তিনি মনে করেন, ওপেনএআই-এর এমন এক সুবিধা রয়েছে যা অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলির নেই—এটি শুরু হয়েছিল একটি গবেষণাগার হিসেবে। তাই গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করাই তার লক্ষ্য।
মন্তব্য করুন