শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কীর্তিনাশা নদীর তীরে অবস্থিত ভোজেশ্বর হাট। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই হাটের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার এই হাটে কবুতরের বিশাল বাজার বসে। আর এই দুই দিনেই বিক্রি হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার কবুতর। দেশি জাত থেকে শুরু করে গিরিবাজ, সিরাজী, রেসিং, হোমার, টিপলার ও ময়ূরপঙ্খি জাতের কবুতর মিলছে এখানে। কোনো কোনো জাতের জোড়ার দাম উঠে যাচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জমিদারদের উদ্যোগে নৌপথে যোগাযোগ সুবিধার কারণে ভোজেশ্বর হাটের গোড়াপত্তন ঘটে। সময়ের পরিক্রমায় এটি পরিণত হয়েছে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত হাট হিসেবে। কবুতরের পাশাপাশি এখানে কৃষিপণ্য, হাঁস-মুরগি, গরু–ছাগল, মাছসহ গৃহস্থালির নানা সামগ্রীও কেনাবেচা হয়। তবে কবুতরের এই হাটই স্থানীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভোজেশ্বর হাটের ইজারাদার নিক্সন খান জানান, প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার হাট বসে। তবে শুক্রবার কবুতরের বেচাবিক্রি সবচেয়ে বেশি থাকে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম। তিনি আরও বলেন, ‘এই হাট আমাদের এলাকার জন্য একটা বড় আর্থিক উৎস। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে এই হাটের ওপর।’
ষাটোর্ধ্ব আবদুল মোতালেব ৪০ বছর ধরে ভোজেশ্বর হাটে কবুতর ব্যবসায় যুক্ত আছেন। তিনি জানান, এ হাটের সঙ্গে তাঁর জীবনের অন্তত ৬০ বছরের স্মৃতি জড়িত। তিনি বলেন, ‘প্রতি জোড়া কবুতরের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহের দুই দিনে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হয়। এই ব্যবসার মাধ্যমেই আমি আমার সংসার চালিয়েছি, সন্তানদের শিক্ষিত করেছি।’
স্থানীয় অনেক শিক্ষার্থীও ভোজেশ্বর হাট থেকে কবুতর সংগ্রহ করে নিজেদের খামার গড়ে তুলছেন। পড়ালেখার ফাঁকে কবুতর পালন করে তাঁরা নিজেদের খরচ নিজেরাই বহন করছেন। নড়িয়া উপজেলার দিনারা এলাকার বাসিন্দা রওশন মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই কবুতর পালন শুরু করেন। তাঁর বাড়ির আঙিনায় এখন একটি কবুতরের খামার রয়েছে, যার আয় দিয়ে নিজের পড়াশোনা ও সঞ্চয় করছেন তিনি। রওশন বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার হাটে আসি। খামার থেকে কবুতর নিয়ে আসি, কখনো বিক্রি করি, কখনো নতুন কবুতর সংগ্রহ করি। শৈশব থেকেই এই হাটের সঙ্গে আমার পরিচয়, আর তখন থেকেই কবুতর পালনের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়।’
কবুতর হাটের পাশেই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কবুতরের খাবার, ওষুধ, খাঁচা ও অন্যান্য সামগ্রীর দোকান। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই দোকানগুলো খোলা থাকে। কবুতরের খাদ্য বিক্রেতা সেলিম হাওলাদার জানান, অনেক ক্রেতাই হাটের দিনে আসতে পারেন না। তাঁদের জন্য দোকানে বিভিন্ন জাতের কবুতর সংরক্ষণ করা থাকে। তিনি বলেন, ‘অনেকে কবুতরের মাংস খান, আবার অনেকেই শখের বশে কবুতর পালন করেন। ফলে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতা এই হাটে আসেন।’
ভোজেশ্বর হাট শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, এটি স্থানীয় সংস্কৃতিরও প্রতীক। শতাব্দীর ঐতিহ্য ধরে রেখে এই হাট আজও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই শত বছরের পুরোনো হাট।
মন্তব্য করুন