পবিত্র রমজান মাসে দিনের দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার পরেও বহু রোজাদারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মাস শেষে তাদের ওজন পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে ক্যালরির ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই লক্ষ্য করেন উল্টোটা। বিশেষজ্ঞরা একে নাম দিয়েছেন ‘রমজান প্যারাডক্স’। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এর পিছনের বৈজ্ঞানিক কারণ ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সমাধান।
বিজ্ঞানীদের মতে, রমজানে ইফতার ও সাহরির সময় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের ফলে সারাদিনের উপবাসের ক্যালরি ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ছাড়িয়েও যায়। ফলে ওজন স্থিতিশীল থাকে বা সামান্য বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি জৈবিক ঘড়ির পরিবর্তন, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থার অতিসক্রিয়তা ক্ষুধা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধর্মীয় নির্দেশনাও রমজানকে শুধু উপবাসের মাস হিসেবে না দেখে মিতব্যয়িতা ও সংযমের মাস হিসেবে বিবেচনা করতে বলে।
‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রমজানের প্রথম এক থেকে দুই সপ্তাহে ওজন সামান্য কমলেও তা স্থায়ী হয় না। মাস শেষে বা ঈদের পরপরই ওজন আবার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসে। এর মূল কারণ হলো ‘ক্যালরি কম্পেনসেশন’ বা ক্যালরি প্রতিস্থাপন। দীর্ঘ সময় উপবাসের ফলে শরীরে শক্তির ঘাটতি তৈরি হয়, যা ইফতার ও সাহরিতে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে পূরণ করার প্রবণতা দেখায়। ফলে দিনের পরিশ্রমের ক্যালরি সাশ্রয় বিফলে যায়।
তবে শুধু খাদ্যাভ্যাসই এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। রমজানে ঘুমের সময়সূচির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিকটবর্তী আরব দেশসমূহের গবেষকদের মতে, সাহরির জন্য রাত জাগা এবং অনিয়মিত ঘুমের কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ প্রভাবিত হয়। ‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানে রাতে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ‘লেপটিন’ এর মাত্রা কমে যায় এবং ক্ষুধাবর্ধক হরমোন ‘ঘেরলিন’ এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ইফতারের সময় মানুষ স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি খাবার গ্রহণ করে।
এর পাশাপাশি মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থা বা ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ‘অ্যাপিটাইট’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইফতারের আগে মানুষের মস্তিষ্ক চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে ইফতারে ভাজাপোড়া, মিষ্টি ও কৃত্রিম শরবত গ্রহণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে শরীর অত্যধিক ইনসুলিন নিঃসরণ করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে ইফতারের কিছুক্ষণ পরেই আবার তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হয় এবং মানুষ বারবার খাবার গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম মানুষকে মিতব্যয়িতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, “তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১)। হাদিসে এসেছে, আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে খারাপ আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। পিঠ সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি বেশি খেতেই হয় তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ বাতাসের জন্য রাখা উচিত।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)।
রমজানে ওজন বৃদ্ধি শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, বরং তা রোজার আধ্যাত্মিক শিক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অতিরিক্ত আহার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায় এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তাই ইফতারে পরিমিত খাবার গ্রহণ, সুষম খাদ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়, বরং সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। তাই এই মাসে স্বাস্থ্য ও ধর্মের সমন্বয়ে জীবনযাপন করাই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।
মন্তব্য করুন