২০২১ সালের দিকে যখন মার্ক জুকারবার্গ নিজের তৈরি করা মেটাভার্সের প্রদর্শনীতে হাজির হন, তখন তার মুখমণ্ডল থেকে ঘাম ঝরছিল। মনে হচ্ছিল, তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তার স্বপ্নের ভার্চুয়াল জগৎ আসলে মানুষের কাছে কতটা হাস্যকর ঠেকছে। কিন্তু সেসব হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও মেটাভার্স প্রকল্পটির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ছিল—একটি ডিজিটাল জগৎ যেখানে মানুষ নিজেদের অবতার নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, সামাজিক মেলামেশা করবে, গান শুনবে, এমনকি অর্থ খরচ করে ভার্চুয়াল জিনিস কিনবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ধূলিসাৎ। মেটা এখন মেটাভার্স প্রকল্প থেকে সরে আসছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর তার ফলে ইন্টারনেট জগৎ এখন পরিণত হয়েছে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে—যেখানে মানুষকে ঘিরে রয়েছে কেবল যন্ত্রনির্ভর আবর্জনা আর হতাশা।
মেটাভার্সের ব্যর্থতা নিয়ে হাসাহাসি করা অনেকের কাছেই মজার বিষয় ছিল। সবাই ভেবেছিল, লেগলেস অ্যাভাটার নিয়ে যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আসলে হাস্যকর ছিল। কিন্তু সেই হাসির মধ্যেই যে মানুষের জন্য একটি সুন্দর ডিজিটাল সামাজিকীকরণের উপায় হারিয়ে গেল, তা অনেকেই ভুলে গেছেন। মেটাভার্স ছিল এমন এক ধারণা যেখানে মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারত নিজেদের অবতার দিয়ে, নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে। কিন্তু সেই সুযোগটাই এখন হারিয়ে গেছে। এর পরিবর্তে আমরা পেয়েছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তৈরি করা অশ্লীল, নিম্নমানের কন্টেন্টের জগৎ—যেখানে মানুষকে শুধুই যন্ত্রের তৈরি আবর্জনার মধ্য দিয়ে বাঁচতে হচ্ছে।
মেটার প্রধান মেটাভার্স অভিজ্ঞতা ‘হরাইজন ওয়ার্ল্ডস’ এখনও চালু রয়েছে একটি মোবাইল গেম হিসেবে। কিন্তু এটি যে একটি ব্যর্থ প্রকল্প ছিল, তা এর নির্মাতারাই স্বীকার করেছেন। মেটার প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু বোসওয়ার্থ স্বীকার করেছেন যে এই ভার্চুয়াল জগৎটি ছিল বিরক্তিকর। বেশিরভাগ ব্যবহারকারী ছিল শিশু, যাদের সাথে একজন প্রাপ্তবয়স্কের কথা বলা অনিরাপদ ছিল। এমনকি যদি সেই শিশুরা নিরাপদ হতেও, তখনও সেই জগৎটি ছিল একঘেয়েমির শেষ সীমা। কোথাও কোনো মজার ঘটনা ঘটত না, কেউ কোনো ভালো কথা বলত না। এমনকি ‘কমেডি ক্লাব’ নামে একটি জায়গায় যখন কোনো ব্যবহারকারী স্টেজে উঠতেন, তখন সেখানে দেখা যেত আট বছরের একটি শিশু টেইলর সুইফটের গান গাইছে। আর এসব কিছু দেখেই মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে মেটাভার্স আসলে কতটা ব্যর্থ একটি প্রকল্প ছিল।
কিন্তু মেটাভার্সের ব্যর্থতা নিয়ে হাসাহাসি করার সময় অনেকেই ভুলে গেছেন যে এই প্রকল্পটি আসলে কতটা সুন্দর একটি ধারণা ছিল। মানুষ এখন আর সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে পারছে না। ইন্টারনেট এখন পরিণত হয়েছে এক বিশাল বাজারে যেখানে মানুষকে শুধুই যন্ত্রনির্ভর আবর্জনার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে। মেটা এখন তাদের সম্পদ ঢেলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। তাদের নতুন প্রজেক্টগুলো হলো এমন সব জিনিস যা মানুষকে আরও বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখবে—যেমন জন সিনার কণ্ঠে কথা বলা চ্যাটবট অথবা ব্যক্তিগতকৃত ভিডিও সামগ্রী তৈরি করার অ্যাপ। কিন্তু এসবই আসলে মানুষের জীবনকে আরও একাকীত্বময় করে তুলছে।
তাই মেটাভার্সের মৃত্যুতে শোক করার সময় এসেছে। কারণ এর সাথে হারিয়ে গেছে সেই সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন যেখানে মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারত নিজেদের অবতার দিয়ে। আর তার পরিবর্তে আমরা পেয়েছি এক ডিজিটাল জগৎ যেখানে মানুষকে ঘিরে রয়েছে কেবল যন্ত্রনির্ভর আবর্জনা আর হতাশা। মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত ছিল সেই সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব নয়। আর তাই মেটাভার্সের মৃত্যুতে আমাদের সবারই শোক প্রকাশ করা উচিত। কারণ সেই স্বপ্নটা ছিল অনেক সুন্দর।
মন্তব্য করুন