যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং সামরিক কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি বিভিন্ন অস্ত্র উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলিতে এই অস্ত্রগুলির ব্যাপক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, সম্ভাব্য বৃহৎ যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত স্টক না থাকার আশঙ্কাও কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলিকে আরও বেশি উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করেছে। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, এসএম সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র, থাড ইন্টারসেপ্টর এবং অন্যান্য অস্ত্রগুলির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো বড় সংঘর্ষে তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সম্প্রতি থাড ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। থাড একটি উন্নত ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ধ্বংস করতে সক্ষম। এর ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন প্রতি বছরে ৯৬ থেকে ৪০০-এর বেশি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১২.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। থাড প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে। এরপর ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান থেকে ইসরায়েলে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এসব ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল।
এছাড়াও, রেথিয়ন নামক প্রতিষ্ঠান এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতি বছর ১২৫ থেকে ৫০০-এর বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসএম-৬ ক্ষেপণাস্ত্র বিমান এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্যাপক পরিমাণে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সম্প্রতি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে। প্রতি বছর ১,০০০-এর বেশি টমাহক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ পাল্লার এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে।
প্যাট্রিয়ট এডভান্সড ক্যাপ্যাবিলিটি-৩ (পিএসি-৩) ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের মধ্যে সম্প্রতি একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রতি বছরে ৬০০ থেকে ২,০০০-এর বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইরান সমর্থিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিরোধে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনেও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যার ফলে তাদের স্টকেও চাপ পড়েছে।
প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (প্রিসিএম) উৎপাদনও চারগুণ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ৪০০-এর বেশি প্রিসিএম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রিসিএম ক্ষেপণাস্ত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর গভীর আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের মতে, এই উন্নতির ফলে তারা ভবিষ্যতে যেকোনো উচ্চ পর্যায়ের যুদ্ধের জন্য অধিক পরিমাণে অস্ত্র মজুদ রাখতে পারবে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের কথা মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন