মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে জানান যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে আনার’ কথা বিবেচনা করছে। কিন্তু তার এই ঘোষণা একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে দেখা যাচ্ছে—যেমন ইরান বিরোধী অভিযানে আরও সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এবং কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ তহবিল চাওয়া। একই পোস্টে ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছেন যে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন কিনা, যেখানে বিশ্বের তেল সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে। অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে চাপে রাখতে সেনা শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছেন।
ইরানও পাল্টা যুদ্ধে নেমেছে। শুক্রবার ইসরায়েলের রাজধানী তেহরানে বিমান হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে নতুন করে হামলা চালায়। যুদ্ধের বিস্তার ঘটেছে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। রমজান মাসের শেষ দিন ইদুল ফিতরের সময়ও সংঘর্ষ থামেনি—দুবাইতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে, জেরুজালেমের প্রাচীন শহরে ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো পড়ে। এখন পর্যন্ত ইরানে ১,৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ বাহিনীর অবস্থানগুলোতে ১০ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে এবং নিহত হয়েছে এক হাজারের বেশি। ইসরায়েলে ইরানের হামলায় মারা গেছেন অন্তত ১৫ জন, আর অধিকৃত পশ্চিম তীরেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনি নওরোজ উপলক্ষে এক বিবৃতিতে ইরানিদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা ভুল যে তাদের আঘাত ইরান সরকারকে ধ্বংস করবে। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি। ইরানের সামরিক মুখপাত্র জেনারেল আবুলফজল শেকারচি সতর্ক করে বলেন যে ইরানের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন পার্ক, পর্যটন কেন্দ্র ও বিনোদন এলাকা আর নিরাপদ থাকবে না। একই সঙ্গে ইরান দাবি করেছে যে তাদের ক্ষেপণস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে, যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে ইরানের ক্ষেপণস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে।
এমনকি যুদ্ধের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে তিনটি নতুন আম্ফিবিয়াস অ্যাটাক জাহাজ এবং প্রায় ২,৫০০ অতিরিক্ত মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরও ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা যারা ইতোমধ্যেই অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে। এই সেনা বৃদ্ধির সঙ্গেই ন্যাটো ইরাক থেকে কয়েকশ সেনাকে সরিয়ে ইউরোপে স্থানান্তর করেছে। অন্যদিকে, ইরান উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আরও চড়া করেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ১০৮ ডলারে উঠে গেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। ফলে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও ধস নেমেছে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল সিরিয়ায়ও হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে তারা দ্রুজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ হামলাকে ‘কল্পনাপ্রসূত অজুহাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। যুদ্ধের প্রভাব এখন স্পষ্টতই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে ইরানের পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা বেড়েই চলেছে।
মন্তব্য করুন