ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বিশেষত দুবাইয়ের মতো শহরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। একাধিক দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে ধনীদের ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে সম্পত্তির বাজারে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থাবর সম্পত্তির দাম ও লেনদেনের পরিমাণে।
চলতি মার্চ মাসের প্রথম বারো দিনেই ইউএইর আবাসন খাতে লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস। একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ৪৯ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাতের কারণে প্রবাসী ধনীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, যা দ্রুত সম্পত্তির দাম কমিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু আবাসন এজেন্ট সম্পত্তির দাম ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ‘বুর্জ খলিফা’র কাছাকাছি অবস্থিত একটি সম্পত্তির উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। পূর্বে যার মূল্য ছিল ৭ লাখ ৩৫ হাজার ডলার, তা এখন বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। একইভাবে দুবাইয়ের অভিজাত পাম জুমেইরাহ এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ফ্ল্যাট ২০ লাখ ডলারে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আগের দামের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এই ধরনের বার্তাগুলো বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে যে, যুদ্ধের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা ও আস্থা দুটোই হ্রাস পেয়েছে।
ইউএইর স্থাবর সম্পত্তি খাতের উত্থান দুবাইয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু টানা পাঁচ বছর দাম বৃদ্ধির পর বাজারে মন্দার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যুদ্ধের কারণে এই মন্দা আরও তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। করমুক্ত নীতির সুবাদে বিদেশি ধনীদের আগমন বৃদ্ধি পেলেও, এখন সেই প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বাভাসও নেতিবাচক প্রভাবিত হয়েছে। সিটি ব্যাংকের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে দুবাইয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি মাত্র এক শতাংশ হতে পারে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা প্রায় চার শতাংশ ছিল। এছাড়া আগামী দুই বছরে সম্পত্তির দাম গড়ে সাত শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এখনই পুরোপুরি নিরাশ হননি। ইমার প্রোপার্টিজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মূল্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৬ শতাংশ কমলেও, কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্রেতা এখনও সুযোগ খুঁজছেন। আফ্রিকার এক ক্রেতা জানিয়েছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে উপযুক্ত সুযোগ পেলে তিনি সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করবেন। এছাড়া পাম জুমেইরাহ এলাকায় একটি নির্মাণাধীন সম্পত্তি গত সপ্তাহেই প্রায় আড়াই কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছে ডেভেলপার আরাডা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সম্পত্তির বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য করুন