ঈদুল আজহা মানেই ভোলার আকাশ-বাতাস জুড়ে ভেসে বেড়ানো মহিষের দধির সুবাস। কিন্তু সেই সুবাস আর স্বাদের গভীরতা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তার অভাবে এবং উৎপাদন ঘাটতির কারণে এই ঐতিহ্যবাহী দইয়ের মান ধরে রাখা যাচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির চাপ আর মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে ভোলার বিখ্যাত ‘বোইষা দই’ আজ তার প্রকৃত স্বাদ হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য কেবল ইতিহাসেই রয়ে যাবে।
ভোলার মানুষের কাছে ‘বোইষা দই’ শুধু একটি খাদ্যই নয়, এটি তাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের অংশ। প্রাকৃতিক উপায়ে মাটির হাঁড়িতে মহিষের দুধ থেকে তৈরি এই দইয়ের ঘন মাখনের স্তরই ছিল এর বিশেষত্ব। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দুগ্ধ খামারিদের অসহায়ত্ব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভেজাল কার্যকলাপের কারণে এই দইয়ের মান আর স্বাদের গুণমান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ক্রেতারা এখন ভেজাল মেশানো দই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা একসময় ভোলার গৌরব ছিল।
ভোলা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক ও কবি আল মনির তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ছোটবেলায় মহিষের দুধ থেকে তৈরি দইয়ের স্বাদ ছিল অন্যরকম। সেই দই উল্টে দিলেও গড়িয়ে পড়ত না, পানিও জমত না। কিন্তু এখন সেই স্বাদ আর পাওয়া যায় না।’ তাঁর কথায় উঠে আসে ভোলার মানুষের মনোজগতে বোইষা দইয়ের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা। দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের সদস্য ফারুক দৌলত জানান, ‘আত্মীয়স্বজন এলে মহিষের দই খাওয়ানো ছিল আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। কিন্তু এখন সেই দই আর পাওয়া যায় না।’
ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় আটশ বছর আগে মেঘনা নদী ও সাগরের মোহনায় জেগে ওঠা চরাঞ্চলে মহিষ পালন শুরু হয়েছিল। সেই থেকেই মহিষের দুধে দধি তৈরির প্রচলন চলে আসছে। এই ঐতিহ্যবাহী দই ২০২৫ সালের মে মাসে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঘাটতি থাকায় এই জিআই স্বীকৃতির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ভোলার সাতটি উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় পঁচিশ হাজার পাত্র দই বিক্রি হলেও ঈদের সময় এই সংখ্যা তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। কিন্তু উৎপাদন মাত্র দশ হাজার লিটার মহিষের দুধ থেকে, আর চাহিদা বিশ হাজার লিটারের বেশি। ফলে গরুর দুধ দিয়ে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে, যা বোইষা দইয়ের প্রকৃত স্বাদ হারানোর অন্যতম কারণ।
মহিষের মালিক ফিরোজ মিয়াজি জানান, ‘আমরা সারা বছর ধরে নির্ধারিত দামে দুধ বিক্রি করি, কিন্তু বাজারে সেই দুধই অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।’ তাঁর মতো বহু খামারি অভিযোগ করেন যে, তাঁদের দুধের দাম বছরের পর বছর একই থাকলেও বাজারে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। চরের ঘাস সংকটের কারণে মহিষ পালনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, ফলে উৎপাদন কমছে। মহিষের দুধের দাম সাধারণ সময়ে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা থাকলেও ঈদের সময় তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। একইভাবে দেড় কেজি দইয়ের দামও বেড়ে গেছে, কিন্তু ওজনেও ভেজাল দেওয়া হচ্ছে বলে ক্রেতারা ক্ষুব্ধ।
মহিষের খামারি মো. মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের দুধের দাম বছরের পর বছর একই থাকলেও বাজারে তা অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার উৎপাদনও কমছে।’ তিনি সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে চারণভূমি সৃষ্টি এবং উন্নত জাতের মহিষ সরবরাহের দাবি জানান। ভোলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘দুধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রচেষ্টা চলছে, কিন্তু উৎপাদন কম হওয়ায় এটি কঠিন।’ তিনি পশু চিকিৎসাসেবা জোরদার এবং বাথান আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মহিষের মালিকদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভোলার ঐতিহ্যবাহী ‘বোইষা দই’ একসময় শুধু নামেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে ভোলার এই শত বছরের ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে। অন্যথায় ভোলার মানুষের সেই সুখস্মৃতিই হয়ে উঠবে শুধু একটি অতীতের গল্প।
মন্তব্য করুন