ProbasiNews
২৩ মার্চ ২০২৬, ৮:৩০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত: স্বাধীনতা হারানো জনজাতি ও উত্তপ্ত ভূরাজনীতি

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নির্ধারিত ‘পেমবার্টন লাইন’ ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু সেই সীমান্তের দুই পাশেই বাস করে একই জনজাতির মানুষ—নাগা, কুকি, চিন। স্বাধীনতার পরেও তারা অবাধে চলাচল করতেন, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকারের কঠোর সীমান্ত নীতি সেই স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে।

২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে ভারতের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির মূল ভিত্তি ছিল মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগ স্থাপন। কিন্তু সীমান্ত অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সেই উদ্যোগকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। স্থানীয় জনজাতিগুলো যেমন নিজেদের ভূখণ্ড হারানোর বেদনা বহন করছে, তেমনি ভারত সরকারও মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল ঠেকাতে কাঁটাতারের প্রাচীর নির্মাণ করছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের আন্তঃসীমান্ত জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে।

সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর মধ্যে মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল মিয়ানমারের সাথে সরাসরি সীমান্ত ভাগ করে। এসব রাজ্যে বসবাসরত খ্রিস্টান জনজাতির মানুষরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু সরকারের কঠোর সীমান্ত নীতি সেই ঐতিহ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নাগাল্যান্ডের নাগা জনজাতি বা মণিপুরের কুকিরা এখন নিজেদের ভূমিতে পরবাসীর মতো অনুভব করছেন।

মিয়ানমারের চিন রাজ্যের ফালাম শহরটি মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিজোরামের রিহ-দিল হ্রদের কারণে পর্যটকদের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন সেই হ্রদেও যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। ভারত সরকার তাদের তালিকাভুক্ত করে পর্যবেক্ষণে রাখছে, যার ফলে স্থানীয় জনজাতিদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারত সরকারের সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে ভারত চায় মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু এর ফলে স্থানীয় জনজাতিদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারও নিজেদের বিরোধীদের দমনে এই সীমান্ত প্রাচীরকে সহায়ক বলে মনে করছে। ফলে দুই দেশের সরকারই নিজেদের স্বার্থে স্থানীয় জনজাতির অধিকারকে উপেক্ষা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো মিয়ানমারের সাথে সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে না তোলা। গত এক দশকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য মাত্র ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যেখানে চীনের অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও সীমান্ত অস্থিতিশীলতার কারণে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের যে স্বপ্ন ছিল, তা অধরাই রয়ে গেছে। ফলে ভারতের পূর্বমুখী নীতির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

স্থানীয় জনজাতিদের নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভারত সরকার তাদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে বিদেশি বিনিয়োগ ও সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। অথচ এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যদি স্থানীয় জনজাতির সাথে সমঝোতার মাধ্যমে সীমান্ত নীতিকে পুনর্বিবেচনা না করে, তাহলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আরও বিপন্ন হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০২৬ সালে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় মেটা, অ্যামাজন, ইপিক গেমস — জানুন বিস্তারিত

এক্স-এ আলোড়ন! এলন মাস্কের হস্তক্ষেপে থমকে দাঁড়ালো ট্রলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত রাখতে যুগান্তকারী আইন আনছেন স্যান্ডার্স ও এওসি

এপস্টাইনের কেলেঙ্কারী: যুক্তরাজ্য ছাড়ার পরামর্শ রাজকুমারী বিট্রিসকে

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বিপদ ঘনীভূত! প্রস্তাবিত সমাধানই কি বিপরীতমুখী ফল আনবে?

‘ডেয়ারডেভিল: বর্ন অ্যাগেইন’ সিজন ২ এপিসোড ২ এর মুক্তির তারিখ ও দেখার উপায়

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এমন কিছু ভুল করবেন না যাতে হতে পারে আইআরএস অডিট

ব্রক লেসনার তাঁর বুকের বিশাল তরবারি ট্যাটুর পিছনের অদ্ভুত গল্পটি ফাঁস করলেন!

নতুন বাড়ির পিছনের জলাশয়ে মিলল অপ্রত্যাশিত অতিথি! রোজিনের জীবনে যোগ দিল এক ব্যাঙ

২০২৬ সালের হারিকেন মরশুমে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে ‘সুপার এল নিনো’! আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস

১০

ছবির দিনের ঠিক আগ মুহূর্তে মা যখন দেখলেন সন্তানের মুখে মার্কার কলমের ছোপ!

১১

ডেলিভারি ড্রাইভারের আবেগঘন স্বীকারোক্তি: তিন বছরের ‘পোষা প্রাণীর বন্ধুত্ব’!

১২

বিশ্বখ্যাত কোচ ব্র্যাড স্টিভেন্সের পদ প্রত্যাখ্যান! ইউনিসিকে দিলেন ফিরিয়ে

১৩

নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনায় বিপ্লব আনতে এআই এজেন্ট তৈরি করল স্টার্টআপ, উঠল ৯ মিলিয়ন ডলার

১৪

১৪ বছর বয়সে ক্যান্সার প্রতিরোধে বিপ্লব: হার্ভার্ডের ছাত্রীর উদ্যোগে ৪০ হাজার যুবকের সামিল হওয়া

১৫

মেগান মার্কলের একপাত্র স্প্যাগেটি: মাত্র বিশ মিনিটে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার

১৬

হঠাৎ ছুটি মানেই এখন বিমানযাত্রা নয় — দাম আর সময়ের ভোগান্তিতে পাল্টে যাচ্ছে ভ্রমণের ধারা

১৭

আয়ের থেকে কম নিয়ে জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব? একজনের অভিজ্ঞতা

১৮

গাড়ি ছাড়াই ভ্রমণের জন্য আদর্শ সাতটি মার্কিন শহর

১৯

ভাইরাল হওয়া আমার বেকারিকে বাঁচিয়েছিল, কিন্তু কখনোই অর্থের জন্য নয়

২০