একটি সাধারণ ক্যামেরা সিস্টেম তৈরির মধ্য দিয়ে নিজের প্রবাসী বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত একজন প্রবাসী। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাই পরিণত হলো এক বিপ্লবী এআই প্রযুক্তিতে। সার্বিয়ান বংশোদ্ভূত স্রদজান স্টাকিক (৪৯) নামের এই ব্যক্তি নিজেই কখনো কোডিং শেখেননি। তাঁর পটভূমি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও চলচ্চিত্র নির্মাণে। তবু তাঁর মাথায় উদ্ভাবন করার চিন্তাটা ঘুরপাক খেতে থাকে যখন তিনি নিজেইStage ৪ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার সময় এআই-এর সাহায্যে তাঁর সমস্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে থাকেন। যখন তিনি ক্যান্সার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। তাঁদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, ইংরেজি না জানায় চিকিৎসকদের সাথে তাঁদের যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছে। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি ডাক্তারদের সাথে হওয়া কথোপকথন রেকর্ড করে এআই-এর মাধ্যমে তা সার্বিয়ান ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করেন।
কিন্তু শুধু অনুবাদ করেই থেমে থাকেননি স্টাকিক। তিনি এমন একটি সিস্টেম তৈরির কথা ভাবতে থাকেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর বাবা-মায়ের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করবে। এমনকি তাঁদের পড়ে যাওয়া বা অসুস্থ হওয়ার মতো ঘটনাও শনাক্ত করবে। তিনি নিজে কোডিং না জানলেও জেমিনি ও চ্যাটজিপিটির সাহায্যে তাঁর ধারণাটিকে প্রযুক্তিগত ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে থাকেন। এরপর তিনি ভাইব কোডিং প্ল্যাটফর্ম ‘লাভেবল’-এর সাহায্যে নিজের আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন। এই প্ল্যাটফর্ম তাঁকে রিয়েল টাইমে তাঁর ডিজাইন পরীক্ষা করতে ও উন্নত করতে সাহায্য করে। তিনি শত শত প্রশিক্ষণ ভিডিও আপলোড করে এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন, যাতে এটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাজের মান বিশ্লেষণ করতে পারে। স্ট্যানফোর্ডের ক্লিনিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করে তিনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন যা রোগীর সাথে সাক্ষাতের সময় প্রদানকারী কর্মীর আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারে।
স্টাকিক তাঁর বসবাসের ঘরে একাধিক ক্যামেরা স্থাপন করে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেন যা পড়ে যাওয়া শনাক্ত করতে পারে। তিনি নিজেই ঘরের মধ্যে পড়ে গিয়ে পরীক্ষা করেন যে সিস্টেমটি তা শনাক্ত করতে পারে কিনা। কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় তিনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেন যা পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন পাঠাতে পারে পরিবারের সদস্য বা জরুরি সেবাকে। এমনকি এটি রোগীর স্বাস্থ্য রেকর্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণও প্রদান করতে পারে। সিস্টেমটি পরিবারের সদস্য ও যত্নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে হওয়া কথোপকথনও বিশ্লেষণ করতে পারে। যদি কোনো যত্নকারী অসভ্য বা অপেশাদার আচরণ করে, তাহলে তা শনাক্ত করে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে। স্টাকিক তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করলেও তিনি জোর দেন যে তিনি কাউকে গোপনীভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চান না। যখন কোনো সমস্যা শনাক্ত হয়, তখন সিস্টেমটি ঘটনার প্রায় ৩০ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ তৈরি করে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠায়। এমনকি তা থেকে অ্যাডভোকেসি লেটারও তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে, যা যত্নকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে তা কতটা মানসম্পন্ন ছিল তা তুলে ধরে।
এই উদ্ভাবন শুরুতে শুধুমাত্র নিজের পরিবারের জন্য হলেও, অনেকে তাঁর কাছে জানতে চান যে তাঁরা নিজেদের বাবা-মায়ের জন্য এমন ব্যবস্থা পেতে পারেন কিনা। তাই স্টাকিক তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে সকলের জন্য উপলব্ধ করতে ‘অ্যালভিস’ নামে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটি প্রাইভেট বিটা মোডে রয়েছে এবং আগামী ১৩ এপ্রিল পাইলট কোহর্ট চালু করার জন্য অপেক্ষমান তালিকা গ্রহণ করছে। সাবস্ক্রিপশন মডেলের মাধ্যমে এই সেবা প্রদান করা হবে, যার প্রিমিয়াম ভার্সনে এআই বিশ্লেষণ সুবিধা থাকবে। সম্প্রতি তাঁর মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি এআই প্রযুক্তির চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার দেখতে পান। তিনি এআইকে রিয়েল টাইম মেডিক্যাল ইন্টারপ্রেটার হিসেবে ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ল্যাব রিপোর্ট বুঝতে পারেন। এছাড়া এআই তাঁর মায়ের ক্যান্সারের ইতিহাস ও গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শনাক্ত করতে সাহায্য করে। সর্বোপরি, হাসপাতালের ঘরে স্থাপিত তাঁর তৈরি ক্যামেরা সিস্টেমটি তাঁর মায়ের কথোপকথন শুনে তা অনুবাদও করতে সক্ষম হয়। স্টাকিকের মতে, ভাইব কোডিং প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য এআই টুল ব্যবহারের সুযোগকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। এমনকি তিনি নিজেও পুরোপুরি কোডিং না বুঝলেও তাঁর তৈরি প্রযুক্তি কাজ করছে এবং মানুষের উপকারে আসছে।
মন্তব্য করুন