হিজরি দ্বিতীয় সাল থেকে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসা ঈদ আজ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় উৎসব হলেও ঈদ বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ভ্রাতৃত্ববোধ, সাম্যচেতনা ও আনন্দের বহুমাত্রিক প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকেই বাংলা সাহিত্যে ঈদকেন্দ্রিক সাহিত্য নির্মাণ শুরু হয়েছে, যা ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
ঈদ সাহিত্যের সূচনা নিয়েও রয়েছে নানা মতভেদ। ড. আনিসুজ্জামান সম্পাদিত মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র থেকে জানা যায়, মুন্সী মোহাম্মদ আসাদ আলী ১৯০২ সালে কলকাতার মাসিক প্রচারক পত্রিকায় তাঁর ‘ঈদুল-আজহা’ কবিতাটি প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘খান সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঈদকেন্দ্রিক কবিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ১৯০৩ সালে মাসিক নবনূরে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর কবিতায় মুসলমানদের ঐক্যের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—‘আজি প্রভাতের মৃদুল বায়রঙে নাচিয়ে যেন কয়ে যায়/ মুসলিম জাহান আজি একতায় দেখ কত বল ধরে।’
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি বাংলা সাহিত্যে ঈদ সংক্রান্ত অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রচনা। ইসলামি ঐতিহ্য ও সাম্যের বার্তা সমৃদ্ধ এই গানটি আরব বিশ্বের বিখ্যাত গান ‘ইয়া লাইলাতুল ঈদ’-এর মতোই বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নজরুলের ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় প্রান্তিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের দিকটি বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদমুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’
বাংলা সাহিত্যে ঈদের চেতনা ধারণ করেছেন আরও অনেক কবি ও লেখক। কায়কোবাদের ‘ঈদ আবাহন’ কবিতায় মুসলমানদের মিলনের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—‘আজি এ ঈদের দিনে হয়ে সব এক মন প্রাণ/ জাগায় মোসলেম সবে গাহ আজি মিলনের গান।’ শেখ ফজলল করিম তাঁর ‘ঈদ’ কবিতায় ইসলামি জাগরণের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। গোলাম মোস্তফার কবিতায় ঈদের চাঁদের সঙ্গে নবীর হাসিমুখের সাদৃশ্য ফুটে উঠেছে—‘আহা কতই মধুর খুবসুরাত ঐ ঈদের চাঁদের মুখ/ ও ভাই, তারও চেয়ে মধুর যে ওর স্নিগ্ধ হাসিটুকু।’
বাংলা কথাসাহিত্যে ঈদের বিষয়টি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উঠে এসেছে। ইবরাহীম খাঁর ‘পুটু’ গল্পে একটি বকরির বাচ্চাকে ঘিরে মানবিকতার জয় দেখা যায়। মূর্তজা বশীরের ‘লাল লুঙ্গি’ গল্পে একজন দরিদ্র রিকশাচালকের ঈদবেদনা তুলে ধরা হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘সাহেবচান্দের ঈদভোজন’ গল্পে ঈদের আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশের বিপরীতে একজন মানুষের অপ্রত্যাশিত ভোগান্তির গল্প বর্ণিত হয়েছে। অপরদিকে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ঈদ’ গল্পে শ্রেণিবৈষম্যের নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। তাঁর গল্পের চরিত্র রজবের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, দরিদ্র মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ কতটা দুর্লভ।
বাংলা সাহিত্যে ঈদ নিয়ে রচিত সাহিত্যকর্মগুলো শুধু ধর্মীয় উৎসবকেন্দ্রিক নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক বৈষম্য, ভ্রাতৃত্ব ও স্বপ্নের বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত। বাংলা সাহিত্যের এই ধারা ভবিষ্যতেও নতুন নতুন আঙ্গিকে ও বিষয়ে সমৃদ্ধ হতে থাকবে বলে আশা করা যায়। ঈদ সাহিত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে মানবিকতার সেই চিরন্তন বার্তা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে একত্রিত করে।
মন্তব্য করুন