২০২২ সাল থেকে শুরু করে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের টেলিভিশন দুনিয়ায় এক বিরাট পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত অনুলিপিহীন (unscripted) রিয়্যালিটি শোগুলোর সংখ্যা এক তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে। এক সময় দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলো এখন ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। পর্দার পেছনের কাহিনীগুলো জেনে নিয়ে দর্শকরা যখন নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন, তখন এই শোগুলো ছিল তাদের অন্যতম প্রিয় বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু এখন সেই দিনগুলো যেন হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।
বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘদিন ধরেই রিয়্যালিটি শোগুলো ছিল দর্শকদের কাছে আদর্শ বিনোদনের অন্যতম উৎস। ‘ডান্স বাংলা ডান্স’, ‘বাংলাদেশের সেরা কণ্ঠ’, ‘এসো গল্প করি’র মতো অনুষ্ঠানগুলো দর্শকের মন জয় করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ধারার অনুষ্ঠানগুলোর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রযোজনা ব্যয় বৃদ্ধি, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থান। অনেক চ্যানেলই এখন পুরোনো ধারার রিয়্যালিটি শোগুলো বাদ দিয়ে নতুন ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়েব সিরিজ, ডকুড্রামা এবং ইউটিউব ভিত্তিক অনুষ্ঠান।
একজন মিডিয়া বিশ্লেষকের মতে, “বাংলাদেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি এখন এক বিরাট পরিবর্তনের মুখোমুখি। দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে চ্যানেলগুলোকে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে। রিয়্যালিটি শোগুলো এক সময় যে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারত, এখন সেই অবস্থা নেই। কারণ দর্শকদের কাছে এখন আর শুধু টিভির পর্দা নয়, ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” তিনি আরও বলেন, “অনুলিপিহীন অনুষ্ঠান তৈরিতে প্রচুর অর্থ এবং সময় ব্যয় হয়। সেই তুলনায় দর্শকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক চ্যানেলই এ ধরনের অনুষ্ঠান থেকে সরে আসছে।”
বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতে রিয়্যালিটি শোগুলোর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন দর্শকদের কাছে আরও সহজলভ্য এবং ইন্টারেক্টিভ। ফলে অনেক দর্শকই এখন ঘরে বসে নিজেদের পছন্দের কনটেন্ট দেখতে পারছেন। টিভি চ্যানেলগুলোকে এখন সেই প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক চ্যানেলই তাদের পুরোনো অনুষ্ঠানের স্টাইল পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, অথবা নতুন ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে যাতে করে তারা দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রিয়্যালিটি শোগুলো একেবারে হারিয়ে যাবে না। বরং এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই ধারাটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে। দর্শকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় এবং ইন্টারেক্টিভ করে তুলতে হবে। অনেক চ্যানেলই ইতোমধ্যে এই দিকে নজর দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু চ্যানেল এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে রিয়্যালিটি শোগুলোকে আরও জনপ্রিয় করে তুলছে। ফলে ভবিষ্যতে হয়তো আমরা রিয়্যালিটি শোগুলোর নতুন রূপ দেখতে পাবো, যেখানে টিভি এবং ডিজিটাল মাধ্যম এক হয়ে কাজ করবে।
মন্তব্য করুন