দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কুকুর মাংসের খামারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে মাত্র আটটি কুকুর বেঁচে ফিরেছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল ফিনিক্স নামের এক কুকুরী। আগুনে পুড়ে যাওয়া সেই খামারের মালিক তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু স্থানীয় প্রাণী অধিকার সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপে ফিনিক্স বেঁচে যায় এবং নতুন জীবন লাভ করে।
এই ঘটনাটি কেবল একটি জীবনের পরিবর্তনই ঘটায়নি, বরং দক্ষিণ কোরিয়ায় কুকুর মাংস শিল্পের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিকেও আরও জোরদার করেছে। আগামী বছর থেকে এই শিল্পটি পুরোপুরি অবৈধ হয়ে যাবে। ফিনিক্সের জীবনের পরিবর্তন মূলত মানবতার এক আলোকিত দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
ফিনিক্স যখন দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংবুক প্রদেশের ওই কুকুর মাংসের খামারে ছিল, তখন তার নাম ছিল গুওন। সেখানে তাকে হত্যা করা হবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই আগুনে প্রায় সাতশ কুকুর মারা যায়। মাত্র আটটি কুকুর জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়। তাদের মধ্যে দুটি কুকুর পরবর্তীতে তাদের আঘাতের কারণে মারা যায়। ফিনিক্সও গুরুতরভাবে পুড়ে গিয়েছিল এবং তার মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রাণী অধিকার কর্মীদের প্রচেষ্টার ফলে খামারের মালিক ফিনিক্সকে এক বিশেষজ্ঞ পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে রাজি হন।
চিকিৎসার পর ফিনিক্সকে পুনর্বাসনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কানাডায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মন্ট্রিলের কাছে অবস্থিত হিউমেন ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিম্যালস নামের একটি প্রাণী কল্যাণ সংস্থার যত্নে ফিনিক্সকে রাখা হয়। সেই সংস্থাটির কর্মীরা তাকে নতুন জীবন দেওয়ার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে। অবশেষে মন্ট্রিয়ল নিবাসী টানিয়া থিবোডোর নামের এক মহিলা ফিনিক্সকে দত্তক নেন।
টানিয়া থিবোডোর ফিনিক্স সম্পর্কে বলেন, “ফিনিক্স প্রকৃত অর্থেই একজন বেঁচে যাওয়া যোদ্ধা। সে অত্যন্ত নির্মমতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং একটি ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে বেঁচে এসেছে। সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সে এখন আমার ঘরে নিরাপদে এবং ভালোবাসায় রয়েছে। তার গল্পটি সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।” ফিনিক্স তার নতুন জীবনে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। টানিয়া বলেন, “সে খুব কৌতূহলী এবং দ্রুত শিখতে পারে। যখন সে কিছু বুঝতে চেষ্টা করে, তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। সে অন্যান্য কুকুরদের সাথে খেলতে ভালোবাসে এবং যে কষ্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তা সত্ত্বেও সে শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ। এমন একটা প্রাণীকেও যে এত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তা জানতে পেরে খুব দুঃখ লাগে।”
ফিনিক্স এখন টানিয়ার ঘরে শান্তিতে বসবাস করছে। টানিয়া তাকে দত্তক নেওয়ার কয়েকদিন পরেই উইলো নামের একটি গোল্ডেন রিট্রিভারকেও দত্তক নিয়েছিলেন। দুজনেই এখন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়ে উঠেছে। টানিয়া বলেন, “তারা দুজনেই পরস্পরের সেরা বন্ধু হয়ে উঠেছে এবং তাদের একসাথে দেখলে আমার মন আনন্দে ভরে ওঠে।”
টানিয়া হিউমেন ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিম্যালস সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমি ওই সংস্থাটির প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, কারণ তাদের মাধ্যমেই ফিনিক্সের মতো কুকুরদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় কুকুর মাংস শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা শুনে আমি খুবই আনন্দিত, কারণ এর মাধ্যমে আর কোনও কুকুরকে ফিনিক্সের মতো কষ্ট সহ্য করতে হবে না।”
হিউমেন ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিম্যালস দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচারণা ব্যবস্থাপক সাংকিউং লি বলেন, “এই কুকুর মাংসের খামারের অগ্নিকাণ্ডে শত শত কুকুরের মৃত্যু একটি বড় ট্র্যাজেডি হলেও ফিনিক্সের জীবনীশক্তি ও বেঁচে থাকার গল্পটি অনুপ্রেরণার। সে একটি কুকুর মাংসের খামারে জন্মগ্রহণ করেছিল, যেখানে তাকে হত্যা করে খাওয়া হতো। প্রায় সব কুকুরের মৃত্যু ঘটেছিল সেই অগ্নিকাণ্ডে। নিজেকে বাঁচিয়ে সে একটি ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন সে কানাডায় নতুন জীবন পেয়েছে যেখানে তার প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন রয়েছে।”
হিউমেন ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিম্যালস নামের সংস্থাটি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কুকুর ও বিড়াল মাংস শিল্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলিতে তারা আইন প্রণয়ন, সামাজিক সম্পৃক্ততা, প্রাণী উদ্ধার, জলাতঙ্ক টিকা কর্মসূচি এবং জীবিকা পরিবর্তন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবর্তন আনছে। স্থানীয় অংশীদারদের সাথেও মিলে তারা কাজ করে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন