ঠান্ডা যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কঙ্গোর জাতির জনক প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই হত্যাকাণ্ডের দায় বহন করেনি কেউ। শুধু কঙ্গোর সাধারণ মানুষই নয়, গোটা আফ্রিকার মানুষের কাছে এই হত্যাকাণ্ড এক অবিস্মরণীয় ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর চক্রান্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল লুমুম্বাকে, কিন্তু সেই হত্যার জন্য কোনও দেশের সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও বিচার হয়নি। ফলে ইতিহাসের পাতায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দায় এখনও অনুল্লেখ্যই রয়ে গেছে।
লুমুম্বা ছিলেন কঙ্গোর স্বাধীনতার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নেতৃত্বে কঙ্গো স্বাধীন হয়েছিল বেলজিয়ামের উপনিবেশ থেকে। কিন্তু তাঁর সমাজতান্ত্রিক ও স্বাধীনচেতা নীতির কারণে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম তাঁকে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সিআইএ সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে উৎখাত করার পরিকল্পনা করেছিল। অবশেষে ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হত্যা করা হয়। কিন্তু সেই হত্যার পরও কোনও বিচার হয়নি, কোনও দেশের সরকার ক্ষমা চায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের চোখেও এই হত্যাকাণ্ড থেকে যায় অনাচারের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে।
লুমুম্বার হত্যার পর কঙ্গোর রাজনীতিতে শুরু হয়েছিল অস্থিরতা। সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের কারণে কঙ্গো পরিণত হয়েছিল এক অরাজক রাষ্ট্রে। লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর অনুসারীরা ক্ষমতায় এলেও তাঁরা ছিলেন বিদেশী শক্তির নিয়ন্ত্রণে। ফলে কঙ্গোর মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে মুছে যায়। লুমুম্বার হত্যার দায় বহন করতে হয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বেলজিয়ামকে। তবে আন্তর্জাতিক মহল এখনও এই হত্যাকাণ্ডকে ঠান্ডা যুদ্ধের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করে।
বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এমন হত্যাকাণ্ডের দায় বহন করা উচিত ছিল। কিন্তু লুমুম্বার হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনও দেশ তাঁদের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বেলজিয়াম সরকার কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই হত্যার দায় স্বীকার করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের চোখেও এই হত্যাকাণ্ড থেকে যায় অন্যায়ের এক কালো অধ্যায় হিসেবে।
লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আফ্রিকার মানুষের মধ্যে বিদেশী হস্তক্ষেপ ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই হত্যার দায় বহন না করায় আন্তর্জাতিক মহল এখনও আফ্রিকার মানুষের উপর অন্যায় করার অধিকার রাখে বলে মনে করে অনেকেই। ফলে আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে লুমুম্বার মতো নেতাদের অবদান। তাঁদের অবদানকে স্মরণ না করায় আফ্রিকার মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন