মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে গত কয়েক দিনে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দেন। তার এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একইসঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ পাল্টা বার্তা দিয়ে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলি ধ্বংস করার জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে, তা হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার প্রস্তুতি ইরান ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে।
ট্রাম্পের এই হুমকির পরই ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি নয়। ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বার্তাকে জ্বালানির দাম কমানোর জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে হামলাটি স্থগিত করা হয়েছে পাঁচ দিনের জন্য, যাতে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে তারা এই আলোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে অচিরেই একটি বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হওয়ায় এখানে কোনও ধরনের সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের পাল্টা হুমকি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যে কোনও মূল্যে তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের চাপ প্রয়োগের ফলে ইরান আরও শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা নির্বাচনী কৌশলের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এই ধরনের কঠোর অবস্থান দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সব পক্ষকে সংযম অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে সামরিক সংঘাতের কোনও সমাধান হতে পারে না এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা। কারণ সামরিক সংঘাত কোনও পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে না, বরং তা আরও অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা গোটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই সব পক্ষকে এখনই সংযম অবলম্বন করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
মন্তব্য করুন