যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য কী? কেনই বা ইরান এতটা অনমনীয় হয়ে উঠছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে দ্রুত বিজয় আশা করলেও ইরান কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও রকম সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নিয়েও ধোঁয়াশায় রয়েছেন বিশ্লেষকরা। তবে এর পেছনে কাজ করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কারণ।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তথ্যযুদ্ধ তীব্র হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মতোই ইরানও নিজেদের স্বার্থে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইরান নিজেদের সামরিক শক্তির মহিমা প্রচার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যযুদ্ধে ইরানকে পরাস্ত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে। এমনকি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকেও জাগিয়ে তোলা সম্ভব হবে এই প্রচারণার মাধ্যমে।
অপরদিকে, ইরানের হুমকি সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে তেমন কোনও সমস্যা দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি সংকট তৈরি করেও, তাহলেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বিকল্প পথ তৈরি করেছে। ফলে তেলের দাম এখনও নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। এমনকি আজারবাইজান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোও অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করে ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি বিশ্ব অর্থনীতিতে।
কিন্তু যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যাচ্ছে চীনের ওপর। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয় চীনে। ফলে ইরানের ওপর চীনের নির্ভরতা প্রচুর। যুদ্ধের কারণে চীন এখন তেল সরবরাহের জন্য লোহিত সাগরের পথ বেছে নিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে চীনের ওপর তাদের প্রভাব আরও বাড়বে। এমনকি ট্রাম্প সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক স্থগিত করেছেন বলে জানা গেছে, যার পেছনে এই কৌশলগত হিসেবই কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের একটি অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করতে। ফলে ইরান যুদ্ধ শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
মন্তব্য করুন