মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ ঘনীভূত যুদ্ধের আঁচড় থামাতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন পাঁচটি মারাত্মক ফাঁদ অপেক্ষা করছে, যেগুলো এড়াতে না পারলে যুদ্ধ আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। সাম্প্রতিক দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা ও তার পরিণামে ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা যুদ্ধের পরিসরকে কেবলই প্রশস্ত করেছে। একইসঙ্গে এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে রাজনীতিবিদদের তৈরি করা যুদ্ধের সীমারেখা কতটা অনিশ্চিত। ট্রাম্প প্রশাসন এখন চেষ্টা করছে যুদ্ধের পরিসর নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধ নিজের নিয়মেই চলতে থাকে।
দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার পরে ইরান গাল্ফ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্বানুমোদন ছাড়াই এই হামলার বিষয়ে অবগত ছিল না। একইসঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে ইরান যদি কাতারের উপর পুনরায় হামলা চালায় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। তবে এই ধরনের হুমকি যুদ্ধের পরিসরকে আরো প্রশস্ত করতে পারে এবং ইরানকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করবে।
যুদ্ধের পরিসর নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানী রবার্ট পেপের তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধের ক্ষেত্রে হুমকি প্রদান করা হলেও তা প্রায়শই পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রাম্পের হুমকি ইরানকে আরও বেশি উৎসাহিত করতে পারে নিজেদের সামরিক শক্তির প্রদর্শন ঘটাতে। দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার পরে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা যুদ্ধের গতিপথকে অনিশ্চিত করে তুলছে। একবার সামরিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আরেকটি বড় ফাঁদ হলো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। ইসরায়েলের একতরফা সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদিও যুদ্ধের পরিসর নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, কিন্তু ইসরায়েল তার নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনে অধিকতর সক্রিয় হতে পারে। ইরানের শক্তিকে দুর্বল করতে ইসরায়েল ইরানের শক্তির উৎসগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বিষয়টি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কাতারকে রক্ষা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলেও যুদ্ধের পরিসর প্রশস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বৃদ্ধি পাবে।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি মারাত্মক ফাঁদ হলো মার্কিন নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি। ট্রাম্প প্রশাসন একইসঙ্গে ইরানকে হুমকি দিচ্ছে এবং ইসরায়েলের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের প্রতিশ্রুতি পালন করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। যুদ্ধের পরিসর প্রশস্ত হতে থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে নয়তো নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছেন যে ইরান যুদ্ধ কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ নয়, কিন্তু একইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার বলেছেন যে তিনি কোনো স্থল সেনা পাঠাবেন না, তবে ইউএসএস ট্রিপোলির মতো যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওয়ানা হয়েছে। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বিবৃতি যুদ্ধের পরিসরকে আরো জটিল করে তুলছে।
শক্তির রাজনীতির এই খেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। ইরান যুদ্ধের পরিসর নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই নিজের মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। যুদ্ধের পরিসর প্রশস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় যুদ্ধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন