যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর দ্বিধাহীন উপস্থাপনা। তিনি যখনই কোনো সংঘাতের কথা বলেন, তখনই তাঁর মনে ভেসে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি—পার্ল হারবারের আকস্মিক আক্রমণ থেকে শুরু করে উইন্সটন চার্চিলের বিজয়ী রণধ্বনি পর্যন্ত। ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর নীতিও এই যুদ্ধকালীন মানসিকতারই প্রতিফলন। ট্রাম্প মনে করেন, ইরান শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদর্শিক শত্রু, যাকে পরাজিত না করা পর্যন্ত শান্তি আসবে না।
ট্রাম্পের ইরান নীতির মূল ভিত্তি হলো ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ। তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক হুমকি শুধু নীতি পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়—এগুলো ইরানকে পরাজিত করার সরঞ্জাম। তিনি বারবার বলেছেন, আগেভাগে ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা না হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এমনকি তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের সমালোচনা করে বলেছেন, স্টারমারের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য আর চার্চিলের যুগে ফিরে যায়নি।
ট্রাম্পের বিশ্বযুদ্ধকালীন মানসিকতা তাঁর সামরিক কৌশলেও প্রতিফলিত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, যুদ্ধে বিজয় আসে দ্রুত, আকস্মিক ও শক্তিশালী আঘাতের মাধ্যমে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন বিমান হামলার আগে মিত্রদের কোনো পূর্বাভাস না দেওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘কে জানে পার্ল হারবারের চেয়ে ভালো আর কেউ?’ তাঁর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি যুদ্ধের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা বা সম্মিলিত কৌশলের চেয়ে আকস্মিক আক্রমণকেই প্রাধান্য দেন।
তবে ট্রাম্পের এই যুদ্ধকালীন মানসিকতা বর্তমান ভূরাজনীতির বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো এককেন্দ্রিক যুদ্ধ আর ইরানের মতো অসামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এক নয়। ইরানকে পরাজিত করতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি দখলদারি বা রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু ট্রাম্প কখনোই সেই দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক নন। ফলে তাঁর ইরান নীতিতে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে—একদিকে তিনি বিজয়ের স্বপ্ন দেখেন, অন্যদিকে সেই বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
ট্রাম্পের বিশ্বযুদ্ধকালীন দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি দুর্বলতা হলো তাঁর মিত্রদের প্রতি অবজ্ঞা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ছিল মিত্রশক্তির যৌথ প্রচেষ্টার ফল, কিন্তু ট্রাম্প আন্তর্জাতিক জোটের গুরুত্বকে তেমন আমলে নেন না। তিনি প্রায়ই ন্যাটো সদস্যদের ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেন এবং ব্রিটেনের মতো মিত্রদের কাছ থেকে পূর্ণ সামরিক সমর্থনের প্রত্যাশা করেন। তাঁর মতে, যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের জন্য চাই চার্চিলের মতো দৃঢ়চেতা নেতা, কিন্তু বাস্তবে সেই ধরনের নেতৃত্বের অভাবই তাঁর কৌশলকে দুর্বল করে তুলছে।
এইভাবে ট্রাম্পের ইরান নীতির পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক বিশেষ ব্যাখ্যা। তিনি ইরানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির মতো প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন এবং বিশ্বাস করেন যে শক্তির মাধ্যমেই এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব। কিন্তু তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ভূরাজনীতির জটিলতাকে উপেক্ষা করে এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিকে অস্বীকার করে। ফলে তাঁর ইরান নীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে অথবা ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হবে।
মন্তব্য করুন