সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম তথা জেনারেশন জেড-এর মধ্যে চীনের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ লক্ষ করা যাচ্ছে। গুগল ম্যাপে চীনের বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখে শুরু হওয়া এই আগ্রহ এখন টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং পুঁজিবাদের প্রতি অনাস্থা থেকেই মূলত এই মানসিকতার উদ্ভব। ২০ বছরের রিড অ্যাডামস নামের এক ভ্রমণ বিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা গুগল ম্যাপ ঘেঁটে চীনের বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীতে নিজের সঞ্চয় দিয়ে চীন ভ্রমণ করে তিনি টিকটকে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তাঁর ভিডিওতে তিনি উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমা মিডিয়া চীনকে যে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, তা আসলে তাদের নিজেদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দুর্বলতার স্বীকৃতি। তাঁর কথায়, “পশ্চিমা মিডিয়া সব সময় বলে চীনের সব কিছুই প্রচারণা, কারণ তারা স্বীকার করতে চায় না যে যুক্তরাষ্ট্র কতটা পিছিয়ে পড়েছে।”
অ্যাডামসের মতো অনেক তরুণ চীনের দ্রুত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রাকে আদর্শ হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁরা চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা কর্মসংস্থানের সংকটের মতো সমস্যাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন না। নিউ ইয়র্কের এক তরুণী অ্যালি, যিনি চীনে পড়াশোনা করেছেন, তিনি চীনের উচ্চগতির রেল এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রশংসা করলেও চীনের যুবকদের কর্মঘণ্টার দীর্ঘতা এবং ‘লাইং ফ্ল্যাট’ প্রবণতার সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, নেভাডার ২৬ বছরের ক্রিস্টিয়ান নেমেথ চীনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে চীনের জীবনযাত্রা সুন্দর হলেও সরকারি সেন্সরশিপ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তাঁর মতে, চীনের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক উন্নত। তিনি বলেন, “আমি এখানে আট মাস রয়েছি, আর যুক্তরাষ্ট্রের কথা ভাবতেই ইচ্ছে করে না। যতদিন পারি এখানেই থাকব।”
জেনারেশন জেড-এর অনেকেই চীনের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির কিছু দিককে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করছেন, যখন পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ক্রমশ কমছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ পুঁজিবাদকে সমর্থন করেন, যেখানে ২০২০ সালে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে, চীনের প্রতি মার্কিনদের নেতিবাচক মনোভাবও কমছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ১৯ শতাংশ তরুণ চীনকে শত্রু হিসেবে দেখেন, যেখানে ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জেনারেশন জেড-এর চীনা প্রেম কোনোভাবেই সেখানে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না। প্র্যাট ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং প্রফেসর ইয়িং জু বলেন, চীন দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণে কার্যকর হলেও তাদের ব্যবস্থায় নানা অনিয়ম রয়ে গেছে। তাঁর মতে, চীনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির দিকে ক্রমেই এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেই নির্দেশ করছে। তিনি বলেন, “পুঁজিবাদ যেখানেই থাকুক না কেন—তা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেই হোক বা চীনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণেই হোক—এর মূল চরিত্র একই থাকবে।”
অন্যদিকে, টিকটকের মতো চীনা অ্যাপের জনপ্রিয়তা মার্কিন তরুণদের মধ্যে চীন সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। চীন সরকার যখন টিকটককে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়, তখন আমেরিকানরা বিকল্প হিসেবে রেডনোট অ্যাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এমনকি অনেকে ব্যঙ্গ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যাতে চীন থেকে ডেটা চুরির অভিযোগ তুলতে না পারে, সেজন্য নিজেদের ব্যক্তিগত ডেটা হাতে করে চীনে পৌঁছে দিতেও প্রস্তুত ছিলেন তাঁরা। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে মার্কিন তরুণরা চীনা প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতি থেকে উপকৃত হতে চায়, তবে সেই সঙ্গে তাঁরা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও ভোলেন না।
মন্তব্য করুন