বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে বহু বছর ধরে বহু পরিবারেই একসঙ্গে বসবাস করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতা অনেকটাই কমে আসছে। এমনই এক ঘটনার কথা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক মা-মেয়ে। তাঁরা প্রায় পনেরো বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করেছেন। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তাঁদের একজনকে এক সময় দূরে চলে যেতে হয়েছে। আর সেই পরিবর্তন যে কতটা কষ্টের তা তাঁরা দুজনেই এখন উপলব্ধি করছেন।
লেখিকা তাঁর মাকে নিয়ে পাশাপাশি থাকতেন ষোলো বছর ধরে। এমন জীবনে বহু সুখ-দুঃখের মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু যখন তাঁর মা স্বাস্থ্যগত কারণে প্রায় ছেষট্টি কিলোমিটার দূরে চলে গেলেন, তখন দুজনেরই মনে হলো—এতদিন কাছাকাছি থাকার সুবাদে যেসব স্বাচ্ছন্দ্য তাঁরা ভোগ করেছেন, তা অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। তাঁদের মনের সেই অনুভূতি এখন আরো বেশি করে ফুটে উঠছে।
লেখিকার পরিবারের সঙ্গে তাঁর মা প্রায় পনেরো বছর ধরে পাশাপাশি থাকতেন। তাঁদের দুটি বাড়ির মধ্যে ছিল কয়েক একর জমির বনাঞ্চল। লেখিকা তাঁর দাদুর বাড়িটি কিনে নিয়ে এসে মায়ের বাড়ির পাশেই থাকতে শুরু করেন। তাঁর স্বামীর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছিল। সেই সময় মা একা থাকতে শুরু করেছিলেন। তাই কাছাকাছি থাকাটা তাঁদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিল এমন একটা সম্পর্ক যেখানে একজনের প্রয়োজনে অন্যজন সঙ্গে সঙ্গেই পাশে দাঁড়াতেন।
লেখিকার স্বামীর অসুস্থতার সময় তাঁর মা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। তাঁর সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। এমনকি লেখিকার প্রয়োজনে তিনি নিজেও দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। একবার তাঁর মা গুরুতরভাবে আহত হলে লেখিকা তাঁর পাশেই ছিলেন। তাঁর মায়ের অস্ত্রোপচারের সময়ও লেখিকা তাঁকে নিজের বাড়িতে দেখাশোনা করেছেন। এমনকি কোভিড মহামারীর সময়ও তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। বাগান করেছেন, বেড়াতে গেছেন। লেখিকার জন্য তাঁর মা হয়ে উঠেছিলেন তাঁর জীবনের এক অন্যতম অবলম্বন।
কিন্তু গত বছর তাঁর মা স্বাস্থ্যগত কারণে একটু দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বাড়ি এবং বাগান দেখাশোনা করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই তিনি একটু ছোট একটি বাড়িতে চলে যান। তাঁর নতুন বাড়িটি ছিল তাঁর বোনের বাড়ির কাছে, কিন্তু লেখিকার বাড়ি থেকে প্রায় ছেষট্টি কিলোমিটার দূরে। লেখিকা পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে তাঁর মায়ের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পুরনো জিনিস বিক্রিও করেছেন। কিন্তু তারপরেও তাঁদের মধ্যে একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।
এখন তাঁদের দেখা হয় কম। কিন্তু সেই দেখা হয়ে ওঠাটাও হয়ে উঠেছে আরো বেশি বিশেষ। লেখিকার সন্তানরা তাঁদের দাদিকে খুব মিস করে। তাঁরা তাঁর ড্রয়ারে ছোট ছোট হৃদয়ের ছবিও এঁকে রাখতেন। তাঁর মা এখন তাঁর বোনের সঙ্গে থাকেন। যদিও তিনি এখনো তাঁর নতুন বাড়িকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারেননি। সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে এক শহরে থাকার পর হঠাৎ করে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া তাঁর কাছে বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
লেখিকা এবং তাঁর মা দুজনেই উপলব্ধি করেছেন যে তাঁরা কতটা ভাগ্যবান ছিলেন যে তাঁরা একে অপরের এত কাছাকাছি থাকতে পেরেছিলেন। তাঁদের সেই সম্পর্ক এখন আরো বেশি করে মূল্যায়িত হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে এমন একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে যা তাঁদের সম্পর্ককে আরো মধুর করে তুলছে। তাঁরা এখন একে অপরের বাড়িতে রাত্রিযাপন করতে পারেন। তাঁদের দেখা হয় কম হলেও সেই সময়গুলি হয়ে ওঠে আরো বেশি মূল্যবান।
মন্তব্য করুন