রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার নলপুকুরিয়া গ্রামের মো. হাতেম আলী কৃষক পরিবারের গর্বের গল্প। তাঁর ছেলে মো. শামীম শাহরিয়ার ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের পর বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেলেও, এক দিন অপেক্ষামান ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডারের মৌখিক পরীক্ষার ডাক। বাবার পরামর্শে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন শামীম – এবং ইতিহাস রচিত হলে!
শামীম পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে গেজেটে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়নি। এ নিয়ে বাবা হাতেম আলী বলেন, ‘ছেলেই আমার ডিপিএস’। ঘরবাড়ির দিকে তাকাতে পারিনি। পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া ছেলের নাম যদি গেজেটে না আসে, প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা আমার নেই।’
শামীমের পরিবার কৃষক পরিবার। বাবা হাতেম আলী কৃষক, মা আসমা বেগম গৃহিণী। শামীমের ছোট চাচা হাফিজুর রহমান ১৯৯৫ সালে এসএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই ছবি শামীমের পড়ার টেবিলের সামনে টাঙানো ছিল। সেই ছবি দেখেই শিশু শামীমের স্বপ্ন দেখার শুরু হয়েছিল।
‘মা–বাবা আমাকে কোনো দিন পড়তে বসতে বলেননি,’ বলেন শামীম। ‘তাঁরা সব সময় অনুপ্রাণিত করতেন, যেন পড়াশোনা উপভোগ করি। বাবা বলতেন, তুমি পড়তে থাকো, জানতে থাকো, চেষ্টা করতে থাকো। রেজাল্ট যেমনই হোক, আমার আপত্তি নাই।’
এই অবাধ স্বাধীনতার সুবাদেই স্কুলজীবনে প্রচুর ‘আউট বই’ পড়েছেন শামীম। নানা বই পড়তে পড়তেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নানা বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ঠিক করেন, বিসিএস দেবেন। ঢাকা মেডিকেলে একাডেমিক পড়ালেখার খুব চাপ ছিল। এর ফাঁকে ফাঁকেই টুকটাক ফিকশন, নন–ফিকশন পড়েছেন তিনি। এমবিবিএসের পরের সময়টা ছিল সবচেয়ে মজার। বিসিএসের গাইড বইয়ে হয়তো কোনো বইয়ের নাম পেলেন, হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতে চলে যেতেন। সেই বই কিনে পড়া শুরু করতেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রায় সব একাডেমিক বই পড়েছেন তিনি।
শামীমের জীবন দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা। পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও গেজেটে নাম আসেনি, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে হতাশা নেই। বলছিলেন, ‘অনেক পরিশ্রম করেও তো ব্যর্থ হতে পারে মানুষ। আমি মনে করি, সফলতা কোনো গন্তব্য নয়, এটা একটা যাত্রা। শতভাগ চেষ্টা করার পরেও যদি কিছু না পাই, তাতেও আমি খুশি। কারণ, এই যাত্রায় অনেক অভিজ্ঞতা তো হবে।’
শামীমের গল্প আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশীদের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। বিশেষ করে যারা বিদেশে থাকা সত্ত্বেও দেশের জন্য কাজ করতে চান। শামীমের মতো প্রতিভা দেশের যুবকদের মধ্যে রয়েছে, তাদেরকে সমর্থন করার প্রয়োজন।
গেজেটে নাম প্রকাশের জন্য আবেদন করেছেন এই তরুণ। আশায় আছেন, এবার হয়তো সুখবর মিলবে।
মন্তব্য করুন