বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নেমে এসেছে এক নতুন বিপদের ছায়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এখনও পর্যন্ত সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের খরচ কমানোর উপায় খুঁজতে হচ্ছে। আর সেখানেই দেখা দিচ্ছে কর্মীদের বেতন কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, প্রায় ৫৮ শতাংশ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এ বছর কর্মীদের বেতন কমিয়ে এআই বিনিয়োগের অর্থ সংস্থান করতে চান।
এআই প্রযুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানগুলির খরচ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক নেতাদের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এআই প্রকল্পের খরচ মেটানোর জন্য তারা কর্মীদের বোনাস, স্টক পুরস্কার এমনকি মৌলিক বেতনও কমিয়ে দিতে চান। এই প্রবণতা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলিতে আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীরা চাকরি হারানোর ভয়ে বেতন কমানোর বিরুদ্ধে তেমন প্রতিবাদ করতে পারছেন না। তবে বিশেষজ্ঞরা কর্মীদের পরামর্শ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নিজেদের কাজের মাধ্যমে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে বেতন বৃদ্ধির জন্য দর কষাকষি করেন।
এআই প্রযুক্তির জনক হিসেবে পরিচিত জেনসেন হুয়াং সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, এআই প্রকল্পগুলিতে অর্থ ব্যয় না করলে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন হবেন। অন্যদিকে, একই অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা চামাথ পালিহাপিতিয়া তাঁর স্টার্টআপে এআই প্রকল্পের জন্য ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও এআই প্রকল্পগুলিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, কিন্তু ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই এআই প্রকল্প থেকে পরিমাপযোগ্য লাভ দেখাতে পেরেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলি অন্যান্য খরচ কমিয়ে এআই প্রকল্পের অর্থ সংস্থান করতে চাইছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মীদের বেতন কমিয়ে দেওয়া, পদোন্নতি স্থগিত করা অথবা চাকরি হারানো। উদাহরণস্বরূপ, এইচপি কোম্পানি তাদের আয় বিবরণীতে জানিয়েছে যে, তারা আগামী তিন বছরে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ কর্মী ছাঁটাই করবে, যার ফলে তাদের এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে, ব্লক এবং অ্যাটলাসিয়ান-এর মতো প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই এআই প্রকল্পের জন্য কর্মী ছাঁটাই করেছে।
তবে কর্মীরা যেন হাল ছেড়ে না দেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীরা নিজেদের কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের গুরুত্ব প্রমাণ করতে পারলে বেতন বৃদ্ধির জন্য দর কষাকষি করতে পারেন। শুধুমাত্র এআই সম্পর্কে জানা থাকা যথেষ্ট নয়; কর্মীদের নিজেদের কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে যে অবদান রাখছেন, সেই বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলি কর্মীদের সেই দক্ষতা খুঁজছে যা এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
এই সময়ে কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজেদের অপরিহার্য করে তোলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীদের উচিত নিজেদের কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখা এবং সেই বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের সামনে তুলে ধরা। এছাড়া, কর্মীদের উচিত নিজেদের অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি এবং অনন্য দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্যবান হয়ে ওঠা। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলি কর্মীদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমাতে চায়। সুতরাং, কর্মীরা যদি নিজেদের অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের বেতন না কমিয়ে তাদের ধরে রাখার চেষ্টা করবে।
মন্তব্য করুন